প্রবন্ধঃ সোমনাথ শর্মা

 


মানুষের দিকেঃ এক প্রান্তিক স্বরের জীবন

 কবিতার বাঙ্ময়তার প্রসিদ্ধি পাঁচ ছয়ের দশকের হৃদয়জুড়ে। তীব্র, দুর্দম তার রূপ-রস –গন্ধ-বর্ণ সমেত কবিতারা আসছে সেসময়, তাদের এড়ানো দুষ্কর।  এরই মধ্যে ক্লাসের লাজুক মেধাবী ছেলেটার মত কোনো কোনো বই হাতে পাওয়া যায়, দেখে মনে হয়, ইস আগে পড়িনি!  শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়কে ধার করে বলে ফেলতে হয়, ”দেরী করে এসেছে যে, মনে হয় ভালোবাসি তাকে।প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের মানুষের দিকে সেরকম একটা বই। প্রণবেন্দু প্রথমেই বইয়ের নিয়তি ঠিক করে দেন, মার্ক শাগালের কথাটাকে নিয়ে, এই ব'লে যে, ”If you want to touch people's heart, you must weep softly”। কুম্ভীরাশ্রু নয়, you must weep softly। যে রূপ-রস-গন্ধ বর্ণের ছটায় কবিতা কবিতা হয়ে ওঠে, তার বাইরেও একটা বৈশিষ্ট্য থাকে, তাকে স্বর  ব'লে বোঝার চেষ্টা করছি। ঐ রূপ- রস -গন্ধ যদি ঝালা বলে ধরে নিই, তাহলে স্বরকে আলাপ বলতেই হয়। আরো নির্দিষ্ট করে  বলার স্বাধীনতা নিলে বলে ফেলতে হয়, সম। দুজন ভিন্ন ঘরানার সেতারবাদকের সমে ফেরা দেখে বুঝে নিতে পারি, কোনজন কে। এমনকি দুই সতীর্থের ক্ষেত্রেও এর ব্যতয় ঘটে না।

এ বইয়ের মহৎ গুণ এই যে, এ বই অনন্ত যাত্রাসঙ্গী। এর উত্তরণ, অবতরণ সবই পাথেয়। এই বই দখল করে রাখে যায় না, আগলে রাখে ঢের বেশি।

           “ মানুষকে ভালোবাসবে বলে

            মানুষের জন্ম হয় পৃথিবীতে।

 

          মানুষ কি তবু ভালোবাসে ?

 

কে তাকে ভেতর থেকে বাইরে ঠেলে দেয়?

কে তাকে চঞ্চল ঘূর্ণির নীচে

চেপে রাখে সমস্ত জীবন ?

কে তাকে স্থির বিন্দুর দিকে এগোতে না দিয়ে

সারাদিন সারারাত কোলাহল করে ?

এদিকে মাটির গন্ধে ক্রমশ নিবিড় হয়

মাঠের ওপরে গাছপালা।

ফলসা –গাছের নীচে তরুণীটি প্রেমিকের জন্য বসে থাকে।

ট্রেন থেকে দেখা যায়, টোল খাওয়া জলের ওপরে ছায়া পড়ে

 

সমস্ত ছড়ানো ছিলো-

অন্তত যাদের নিয়ে ,একটি জীবন

খুব ভালোভাবে বেঁচে থাকা যায়।

সূর্য তারার নীচে একটি শীর্ণ নদী বহুদূরে এঁকে বেঁকে গেছে

সেইখানে পা ডুবিয়ে , একটি তাপিত লোক

কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকে।

মানুষ যে ভালোবাসতে পারেনি এখনও

সেই কথা মানুষ জানে কি ?”

                     (মানুষের গল্প/ প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)

 

“মানুষ কি তবু ভালোবাসে ?”- এটুকু শুনে মনে হয়, পুরনো সিনেমার রূঢ় বিবেক অভিনেতাকে।

একটু পরেই ভুল ভেঙে যায় নিজে থেকেই, পর্যাপ্ত তা পাওয়া ডিমের মত-

“কে তাকে ভেতর থেকে বাইরে ঠেলে দেয়?

কে তাকে চঞ্চল ঘূর্ণির নীচে

চেপে রাখে সমস্ত জীবন ?”

আমরা বুঝি, যাত্রাপালার নির্মোহ বিবেক নয়, লাইনগুলো আমাদের চশমা পরা জেঠুর মত, যাকে আমরা পিতার অগ্রজ জেনেই দূরত্বে রেখেছি। “কে তাকে ভেতর থেকে বাইরে ঠেলে দেয়?”- এর সমব্যথা বুঝে আমাদের মনে পড়বে, “if you want to touch people’s heart, you must weep softly”। গোটা বই জুড়ে প্রণবেন্দু এ – কথাটা ভোলেন না, ভোলান না। এতেই ফিরে ফিরে আসেন, একই দরজায় কড়া নাড়ার মত করে।

 জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন,  “এক একটা দুপুরে যেন একটা পরিপূর্ণ জীবন অতিবাহিত হয়ে যায়।” পরিপূর্ণ কথাটাকে শুধু সদর্থকতার নিরিখে দেখলে মানুষের দিকে-র প্রতি আমাদের এ–মত খাটে না। কিন্তু পরিপূর্ণ জীবন মানে শুধু ”অর্থ নয়, কীর্তি নয়, স্বচ্ছলতা নয়- আরো এক বিপন্ন বিস্ময়” বলেও মনে হয়। এই বইটা সম্পর্কে চট করে নির্দিষ্ট একটা সিদ্ধান্তে আসা যে যায় না- এ পরম আশীর্বাদ। সিদ্ধান্ত এখানে বিপজ্জনক, সিদ্ধান্তহীনতা নয়।

 

মানুষের দিকে—কোন মানুষের দিকে? যে মানুষ ইনহেলার নেয়, আবার সিগারেটেও কার্পণ্য নেই। মাফলার শিবের সাপের মত জড়াতে জড়াতে আলু পটলের দর করে- সেরম মানুষ ।

‘সুদিনের জন্য’ কবিতাটার দিকে দু’পৃষ্ঠা পিছিয়ে তাকালেই দেখব, শুরুতে রয়েছে-

 “সুদিনের জন্যে ওরা বুক বেঁধে অপেক্ষায় থাকে সুদিন আসে না” - এই ওরা – কারা ? এই “ওরা”দের নিজেদের মত করে অবয়ব দেবার স্বাধীনতা আছে আমাদের। যখন দেখি প্রণবেন্দু লেখেন- “ওরা হয়তো পাল্টে দিতে চায় পৃথিবীকে, কিন্তু কিভাবে পাল্টাতে হবে, বুঝতে পারে না। লেপ  কম্বল মুড়ে, শবের মত পড়ে থাকে।” আটাত্তর সালে বেরনো এ বইটার পূর্বাপর দেখলে বুঝে নিতে পারি, ওরা কারা, যারা লেপ কম্বল মুড়ে , শবের মত পড়ে থাকে।

মানুষের দিকে-র মূল সুতো লুকিয়ে আছে মানুষেরই দিকে। কোন মানুষ– আবারও পৌনপুনিকতায় বলতে হয়, ব্যক্তিমানুষ । যে মানুষ একক,  যে মানুষ অফিসের ক্লার্ক, কিন্তু সে যখন টিফিন খায় একা বসে খায়। এই যে ব্যক্তিমানুষ, এর অস্তিত্বে সমষ্টি ম্লান হয় না। একই সঙ্গে  তাঁর  “শ্রমলব্ধ নীরবতা” যা কিনা ব্যক্তিমানুষের একার, তা তিনি অতিক্রম করতেও নারাজ। তাই “চুক্তিহীন যোগাযোগ”ই শ্রেয়তর পথ বলে মনে হয় তাঁর ।

এই বইটা পড়লে সত্যজিৎ রায়ের শাখা-প্রশাখার একটা সিন মনে পড়ে। বাবা সামান্য সুস্থ হ’লে ভায়েরা সব সব বেড়াতে গেছে সেই ছোটবেলার বেড়ানোর জায়গায়। চাদর পেতে কফির উদ্যোগ চলছে। চলছে ভায়ে ভায়ে বোঝাপড়া। গোটা বইটা ঐ জায়গাটার মত।  মাঝখান থেকে মমতাশংকরের ছেলের প্রতি উদ্বেগ  “বেশি দূরে যাওনি তো” জীবনমুখীতার উপাদান। এই বইয়ের সব কথাই স্পষ্ট করে বলা। স্পষ্ট করে বলতে গিয়ে কোথাও প্রণবেন্দু দাশগুপ্তকে উচ্চগ্রামে কথা বলতে হয়নি।

এই বই এক উত্তরণের কথা বলে, স্লোগানে নয়, গুঞ্জনেও নয়, স্বতঃসিদ্ধতার মত করে। যে উত্তরণ বইটার “অন্তর্গত রক্তের ভেতর খেলা করে”, তাকে উদ্ভাস দেয় ভাটিয়ারের মত করে।

“ তোমরা যাই বলো-

আমি যতদিন পারি, ততোদিন,

এই নরম মাটির কাছে থেকে যাবো ।”

এই যে থেকে যাবার বাসনা, এ কি নতুন, পারম্পর্‍্যহীন? আরেকবার পিছিয়ে গেলেই খেয়াল পড়বে আমাদের “ মাটি পৃথিবীর টানে মানবজন্মের ঘরে কখন এসেছি না এলেই ভালো হ’ত অনুভব করে এসে যে গভীরতর লাভ হল সে সব বুঝেছি” আর তাই, “তোমরা যা বলো আমি যতোদিন পারি ততদিন এই নরম মাটির কাছে থেকে যাবো”। আমাদের পরতে পরতে আশ্চর্য হতে হয় যেভাবে মানুষের দিকে যেতে চাওয়ার ভঙ্গি প্রণবেন্দু দাশগুপ্তের সে কথা ভেবে।

অশোক মিত্রের প্রবন্ধের বই ছিল, প্রশ্ন উত্তর–উত্তরহীনতা। মানুষের দিকে-তে ও ঐ তিনটের মিলিত অগ্রগতি থেকেছে, কেননা প্রণবেন্দুও জানতেন সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মত, “ভ্রান্তিবিলাস সাজে না দুর্বিপাকে।” তাই তিনি প্রশ্নের আড়ালে ভর্ৎসনা করে বলেই ফেলেন,

“কার জন্যে সাতদিন কবিতা না লিখে

তুমি ব'সে আছো?

এইভাবে কিছুই হবে না।

কোনো জাদু নেই, যাতে এক মিনিটের মধ্যে

সব কিছু সঠিক জায়গায় গিয়ে পৌঁছে যেতে পারে।

তেমন মানুষী নেই, যাকে তুমি সর্বস্ব উজাড় ক'রে দিতে পারো

তেমন বন্ধু নেই, যে তোমাকে, সমস্ত গুজব ছেঁকে,

ঠিকমতো সাড়া দিতে পারে।

 

এখন কী ক'রবে, তুমি ভাবো।

সমস্ত পৃথিবী কিন্তু অন্যদিকে তৈরী হ'য়ে আছে।

জারুলগাছের নিচে বেবি-অস্টিনটাকে কিছুটা থামিয়ে

কারা যেন প্রকৃতির শোভা দেখছে।

দুটো মেয়ে দৌড়ুতে দৌড়ুতে এসে, আবার দৌড়ে দৌড়ে

চ'লে গেলো।

একটা ফানুস উড়লো। দুটো কাক। সন্ধে হ'য়ে আসে।

 

কার জন্যে সাতদিন কবিতা না লিখে

তুমি ব'সে আছো?”

         (কার জন্যে/ প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত)

 

এ বইয়ের অলঙ্কার, উপমা নিয়ে কথা বলার পরিসর বিস্তর। তবু এরই ফাঁকে আমাদের চোখ আটকে থাকে বইটার আরেকটা ধর্মের দিকে। এ বই কোথাও কখনো বাঁক বদল করে না। এমন কোন কথা বলে না এ-বইয়ের এক একটা কবিতা, যা গত পৃষ্ঠার সঙ্গে অসংলগ্ন। মানুষের দিকে চমকে দেয় না। মানুষের দিকে পুরনো কথার মত, অন্যে অনেক বছর পর মনে করালে নতুন লাগে।

ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যোগাযোগ ও লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ spartakasmagazine@gmail.com

  একটি লড়াকু পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্জিত ...