প্রবন্ধঃ অচিন্ত্য মাজী

 




মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা

 মণীন্দ্র গুপ্তের জন্ম ১৯২৬ এর অক্টোবরে প্রথম জীবন কাটে অবিভক্ত বাংলার যশোহরে স্কুল জীবন আসাম এবং পরে কলকাতায় কর্মজীবন অতিবাহিত হয় ব্রিটিশ শাসিত ভারতীয় সেনাবাহিনীতে প্রথম কবিতার বই বেরোয় ১৯৪৯ অন্য দুজন কবির সঙ্গে তাই কাব্যের নাম রাখেনআমরা তিনজন নিজের বইনীল পাথরের আকাশবেরোয় ৪৩ বছর বয়সে ১৯৬৯ সালে  একে একে বেরোয়আমার রাত্রি’ (১৯৭০), ‘মৌ পোকাদের গ্রাম(১৯৭৪), ‘লাল স্কুল বাড়ি’ (১৯৭৮), ‘ছত্র পলাশ চৈত্যে দিন শেষ’ (১৯৮৬), ‘শরৎ মেঘ কাশ ফুলের বন্ধু’ (১৯৩২), ‘নমেরু নামে রুদ্রাক্ষ’ (২০০০), ‘টুং টাং নিঃশব্দ’ (২০০৫), ‘বনে আজ কর্নচেটো’ (২০০৯) ইত্যাদি আত্মজীবনীঅক্ষয় মালবেরীবাংলা গদ্য সাহিত্যের অনন্য সম্পদ রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে একত্রেপরমা’(১৯৬৯) নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেছেন পুরস্কারের মধ্যে পেয়েছেন বিষ্ণু দে স্মৃতি পুরস্কার (২০০৫), রবীন্দ্র পুরস্কার(২০১০), সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (২০১১) ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি এই কবির জীবনাবসান হয়

 

স্বাধীনতা উত্তর বাংলা কবিতার জগতে মণীন্দ্র গুপ্ত একজন বিরল ব্যতিক্রমী কবি তিনি মুলত ষাট দশকের কবি কিন্তু ষাট দশকের সমস্ত ভাঙাচোরা, পঙ্কিলতা আর ক্ষুধার্ত চিৎকার ছেড়ে তিনি এক নির্জন দ্বীপের অধিবাসী  অথচ এই নির্জনতা কোনোভাবেই মানুষকে ছেড়ে হঠকারী হয়ে যায় না বরং নির্জনতার ভেতরের ঐশ্বর্যকে নিংড়ে নিয়ে নিষিক্ত করে নেন নির্জ্ঞানের এক অপরূপ আলোছায়া গভীর পর্যবেক্ষণে বস্তুর ভেতরের উপাদানকে বোধের শুদ্ধতা দিয়ে যেমন বিশ্লেষণ করেন তেমনি সমস্ত হাহাকারের খোলস ধ্বসিয়ে দিয়ে আবিষ্কার করেন কবিতার এক ভিন্ন মার্গীয় আস্বাদ মণীন্দ্র গুপ্তের স্বভাবের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন রয়েছে আশ্চর্য নিরাসক্তি এর ফলে প্রতিটি বিষয়কে তিনি এমনভাবে দেখেন যার মধ্যে আবীলতা ধরা দেয় না

 

সমস্ত চতুরতা, অতি সন্নিবেশ এবং নিপুণ ভাণ থেকে সরে এসে জীবনের অতল গভীরে দৃষ্টিকে নিক্ষেপ করেন বলেই মধ্যবিত্তসুলভ অপ্রাক্তির ক্ষোভ তাঁর কবিতায় প্রতিফলিত নয় মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় এমন এক দ্রোহ আছে যা আমাদের মেকি অনুভূতিকে ছিঁড়ে দিয়ে চিন্তার ভিন্ন ভূবন রচনা করে অতিমাত্রিক প্রদর্শিত কবিতার বিরুদ্ধে  তিনি উপযুক্ত আঘাতও হেনেছেন  বোধের গভীরে নিভৃত এক লড়াইয়ের আস্বাদ মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতাকে করেছে আরো গভীর যা আমাদের প্রচণ্ড কৌশলগুলিকে প্রত্যাঘাত করে চূড়ান্ত সত্যের সামনে সত্তাকে উপস্থিত করে  প্রকৃতি প্রাণী পতঙ্গ মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় আশ্চর্য এক সংকেতের বার্তা নিয়ে আসে যেন আধিদৈবিক এক ক্যানভাসে নিরন্তর ফুটে উঠছে গভীর অনুভবের চিত্রল চলাফেরা পরক্ষণেই তা ঝরে যাচ্ছে ভিন্ন আকুতির গন্ধে এই গমনের সঙ্গমে খেলা করে সংযমী জাদুকরের মায়া মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতার এই বিচিত্র উন্মেষকে আবিষ্কার করতে চেয়েছি এই প্রবন্ধে 

 

 

একজন মহৎ প্রতিভাবান কবির যেরূপ হয় মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতাও বহুমাত্রিক বিচিত্রগামী এরই মাঝে চেতনার একটি কেন্দ্রীয় স্বর বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য নিয়ে আসে এই উপাদানটি হল পৃথিবীকে তীব্রভাবে আবিষ্কার, আমাদের চেনা পরিচিত পৃথিবীকে দৃষ্টির চৈতন্যে নিষিক্ত করে তার ভেতর থেকে দার্শনিকতার এক আলাদা মাত্রা দ্যোতিত করা যা থেকে মানব মনের গভীর প্রদেশেও  আলো ঝিকিয়ে ওঠে মননের কোষ কুসুমগুলিকে সদা জাগ্রত রাখে জাগ্রত, তন্ময় এবং উতরোল এই ঢেউ মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় বিভিন্ন ভাবে আছড়ে পড়তে চেয়েছে প্রথমেই উল্লেখ করা যেতে পারে মণীন্দ্র কাব্যে প্রকৃতির প্রসঙ্গ অন্যান্য কবির মতোই মণীন্দ্র গুপ্ত প্রকৃতিকে তীব্রভাবে ভালোবেসেছেন, পৃথিবীর অপার্থিব সৌন্দর্যে মগ্ন হয়ে আত্মবিভোর হয়েছেন-

তখন বনের মধ্যে অন্য জগৎ

নানা খোপে নানা রঙের হালকা বৃষ্টি পড়ছে

ঘন জঙ্গলে সবুজ বৃষ্টি লাউডগা সাপের মতো পিছলে নামছে

                   গাছের গা বেয়ে

সাদা কালো বৃষ্টি গুচ্ছ দৌড়ে দৌড়ে চলে যাচ্ছে বুকসমান ঘাসবনে

                 ঝুমঝুম সাঁইসাঁই শব্দ

তলায় বৃষ্টিরেখা দেখা যায় না; শুধু দ্রুত ফুটে উঠছে অসংখ্য ছত্রাক

আর ক্ষয়া মাটি যেখানে ব্যাঙের গায়ের মতো মাদক আচ্ছন্ন সেখানে

বনের খোপে খোপে নানা রঙের বৃষ্টি আর বাঁকা রোদ্দুর

           খেলছে শেষ বেলায়  

                                                                         একদিন বনের মধ্যে, লাল স্কুল বাড়ি

ঘন বনের মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে তার একটি অসাধারণ বর্ণনা উপরোক্ত কবিতাটি মেঘ, আকাশ, বৃষ্টি, ঘাসবন, ছত্রাক, ক্ষয়ামাটি, ব্যাঙ, বাঁকা রোদ্দুর ইত্যাদি শব্দগুলি প্রকৃতির একটি বিশেষ অবস্থাকে ব্যঞ্জিত করেছে কিন্তু কবিতাটি শুধু প্রকৃতির বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ থাকে নি এবং কবির দেখা শুধু মুগ্ধতার ভেতরেই আবদ্ধ নয় সাধারণ প্রকৃতির কবিতা থেকে কবিতা অন্য মাত্রায় উত্তরিত কবি আসলে রচনা করতে চান আশ্চর্য এক গতিময় বিন্যাস, স্বঃতস্ফূর্ত স্বচ্ছ মোচড় যেখানে বহুরূপীর ভঙ্গিমায় ন্যুব্জ, রূপান্তরই যার প্রধান ধর্ম সর্বদা ক্রিয়াশীল সচল একটি মুহুর্ত গতির বিভাবে লাবণ্যমুখর হয়ে উঠছে কবিতাটিতে  কোনো মানুষের উপস্থিতি নেই কিন্তু অদৃশ্যভাবে এক মানুষিক সত্তার ছোঁয়া যেন রয়ে গেছে চৈতন্যের ধর্মে যা ব্যাপ্ত হয়ে আছে শরীর থেকে সত্তায়, সম্পর্কের রসায়নে যেমন করে দুটি মানুষ পারস্পারিক সম্পর্কে লিপ্ত হয় ভিন্ন কোনো অনুসন্ধানের আয়োজনে একদিকে রূপান্তরের জাড্যধর্মীতা অন্যদিকে গতির লালনে সম্পর্কের গোপন জিজ্ঞাসাকে আলিঙ্গন এই দুয়ের সংশ্লেষণে কবিতাটিতে স্তব্ধ হয়ে আছে সার্বভৌম সত্তার বিস্ময় আনন্দ প্রকৃতির এই আভ্যন্তরীণ দিব্যোন্মাদ আরতিকে তিনি ধরতে চান-

গ্রামের ছায়াভরা জংলা পথে

বালিকা মেয়ে ঘুরে বেড়ায়

মায়া আর নির্মায়ায় তার মুখখানি যেন অর্ধকালীর,

দক্ষিণ বাম যে দিক দিয়েই দেখি অপরূপ

গোলঞ্চ তার মাথায় ঝরে পড়ে,

বকুল ঝরে ঝরে উড়ে আসে পায়ে

নীরব গাছজগতের এই অপাপ যোনিগুলি তার বড় প্রিয়

সে নীল অপরাজিতা আর লাল জবার কাছে গিয়ে

ফুলের গর্তে কু দেয়                                      

                                                                                    মা, ছত্র পলাশ চৈত্যে দিনশেষ

তন্ত্রের বলে শূন্যের নিরাকার আকারে রূপায়িত হয়ে ওঠে পুরুষ নারীর সম্মিলিত শক্তি তন্ত্রের উপজীব্য চক্রে পুরুষ শিব নারী শক্তি ভৈরব ভৈরবী সবাই সামাজিক বন্ধনহীন ব্রাহ্মণ চণ্ডালে কোনো ভেদাভেদ নেই    তন্ত্র মতে পরমার্থ লাভের জন্য সংসার ত্যাগ করার কোনো প্রয়োজন নেই বস্তুতন্ত্রকে স্বীকার করে তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে সাধনবিধির মার্গীয় রূপ তন্ত্র তন্ত্রসাধকেরা গুরুত্ব দেন গার্হস্থ্য যাপনের সহজ পদ্ধতির মাধ্যমে মোক্ষলাভ তন্ত্র মতে মানবদেহ বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি পদ্ধতি আসলে এক এদের সৃষ্টি প্রক্রিয়ার মধ্যে কোনো বৈষম্য নেই এই বিশ্বসৃষ্টির মধ্যে প্রচণ্ড গতির খেলা চলছে, সর্বত্র পরিবর্তনের লীলায় উৎসারিত আবার এই পরিবর্তনের ভেতরেও স্তব্ধ এক অপরিবর্তন তার দিব্যতা নিয়ে দণ্ডায়মান অর্থাৎ যাকে বাইরে থেকে গতিশীল বলে মনে হচ্ছে তা আসলে স্থির আবার যাকে স্থির হিসাবে দেখি তা আসলে গতিময় রূপান্তরই সৃষ্টির ধর্ম শুধু এই রূপান্তরের পরিণতিকে জানতে হয় কূটস্থ চৈতন্যের চারদিকে ঝলসে উঠছে রূপান্তরের আগুন এই চৈতন্যকে প্রকৃত সত্তার স্বরূপ জেনে নিয়ে পরম সত্যময় হতে হয় এই চৈতন্য অখণ্ড স্বরূপে নিত্য বিদ্যমান তিনি শুধু বিরাজ করেন আর তার চতুর্পাশ্বে প্রকৃতির লীলা সঞ্চালিত হয় প্রকৃতি আবার দুই প্রকার মূলা প্রকৃতি এবং সৃষ্টি প্রকৃতি এই মূলা প্রকৃতিই হচ্ছে কামনা, আদ্যাশক্তি সনাতনী মূলা প্রকৃতি থেকে সৃষ্টি প্রকৃতি রূপ লাভ করে উক্ত কবিতাটিতে প্রকৃতির অব্যক্ত আদ্যাশক্তিকে অনুসন্ধান করা হয়েছে বালিকা মেয়েটি যেন সেই জগন্মাতৃকা যার খেলার ভেতরে ধ্বনিত হয়ে ওঠে সৃষ্টির রূপান্তর যার পরম আমোদে স্থিতি নড়ে ওঠে, স্থিতির ভেতরের পরিবর্তন স্পর্শের লীলায় চঞ্চল হয়ে ওঠে –

ফলে জমে ওঠে রস। গ্রীষ্মের নিভৃত গৃহস্থালি

এই অন্তঃপুর বনে প্রবাদের মতো কর্মরত।

যোজন যোজন দূর চক্রগোলকের মধ্যে সূর্যের আসন

স্থির। অনন্ত ব্যাপক রৌদ্র তবুও তরল ধাবমান

ফলে, এই প্রাণবন্ত ছায়া যেন ক্রমেই গভীর হয়ে নামে।

সেই সময় এইখানে পরি আসে- প্রত্যেক ফলের

কাছে যায়, প্রত্যেক গাছের গূঢ় ছায়াটির চিবুকের কাছে

গিয়ে ওড়ে। - ঝোপে ঝাড়ে সবুজ কাঞ্চন ঝরে,

মৃত্তিকা উদ্ভুত এক সুদূর সৌন্দর্য যেন বনময় থমথম করে

                                                                                            পরবাস, মৌপোকাদের গ্রাম

অসাধারণ বীক্ষায় কবি পর্যবেক্ষণ করে চলেছেন গ্রীষ্মের দুপুরের পৃথিবীকে, হট্টগোলহীন এক স্থৈর্য কবি বুঁদ হয়ে নিংড়ে নিচ্ছেন ধ্যানের নির্ভার প্রসন্নতায়। নির্জন থেকে আরো নির্জন হয়ে ঝুঁকে নামছেন ছায়ার তাপহীন শান্তি মেখে নেবেন বলে। এখানে দৃশ্য প্রচণ্ড নয় আবার একেবারে নরমও নয় – এ দুয়ের মাঝামাঝি হালকা ধূসর রহস্যে কবিতাটি আরো আলগা হয়ে ওঠে যার দুই প্রান্ত ছুঁয়ে থাকে আদিমতা আর আধুনিকতা। কবি প্রকৃতির বহির্বৈচিত্র্যের রন্ধ্রপথ বেয়ে ঢুকে যান তার গাঢ় গহীন আধ্যাত্মিক অঞ্চলটিতে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকেন তার অন্তর্গত অন্ধকার আর সুষুপ্তির মগ্নতা। মণীন্দ্র গুপ্তের নিজের ভাষায়  -

প্রত্যেক ফুলের পাপড়ির কেন্দ্রে একটা সূক্ষ্ম ফুটো আছে, সেই ফুটো গিয়ে শেষ হয়েছে বোঁটার প্রান্তে। ঐ পথটুকু যাদুপথ। কেউ যদি অতি সূক্ষ্ম হয়ে ছুঁচের মতো ঐ পথের একমুখ দিয়ে ঢুকে অন্যমুখ দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে তবে সে পৌঁছাবে এক অন্য রাজ্যে। এক এক ফুলের পথের শেষে এক এক রাজ্য। শিউলি ফুটের ফুটো দিয়ে বেরুলে পাওয়া যাবে সাদা মেঘের দেশ। লাল সন্ধ্যামণির ফুটোর ওপারে আছে খুব সুন্দরী, আবছায়ায় চলাফেরা করা মেয়েদের দেশ। জ্যোৎস্নায় ফোটা হাসনুহানা ফুলের সূক্ষ্ম পথটুকু পেরুলেই ঝাড়লণ্ঠন নিবে আসা এক চাঁদনী জলসার দেশ। আর গ্রীষ্মের তাপে শুকিয়ে মুচমুচে হয়ে যাওয়া স্বর্ণচাঁপার ফুটো দিয়ে বেরুলেই মুনশিবাড়ি।

প্রকৃতির নির্জন সন্নিপাতে এ আসলে সূক্ষ্ম থেকে আরো সূক্ষ্মতার দিকে যাতায়াত, যে গমনের ভেতরে ফুটে থাকে অপুর্ব বিস্ময় যে যাত্রাপথে ধরা থাকে মমতার নির্মেদ অভিব্যক্তি। কবি যেন বেপরোয়া উদ্দাম হয়ে মিশে যেতে থাকেন সেই কোমল আলোময় উদ্ভিজ্জের ক্রোড়ে, তার ছটফটানির ভেতরে আত্মগোপন করে থাকে লাবণ্যের শীতল দিব্যতা। প্রেমের গৈরিক ঝাপটায় অতল অতল থেকে দুলে উঠছে সত্তা । মাটির নিরাবরণ গন্ধ মণীন্দ্র গুপ্তের বরাবরের প্রিয়। তিনি যাপনে ছিলেন একেবারে সাদাসিধে, অনাড়ম্বর, সরল। জৌলুষতাকে তিনি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতেন। অর্থের অহংকার থেকে থাকতেন দূরে। বরং মাটির গন্ধে যে সারল্য আর অকৃত্রিম উত্থান জড়িয়ে আছে সেই সোঁদা গন্ধের নিরালায় নিজেকে সংলীন করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে কবি বিখ্যাত, অভিজাত, ভারী মানুষদের এড়িয়ে চলতেন। অবাধ কৌতুহল ছিল কৃষক, সন্ন্যাসী, সাধু, ধোপা, নাপিত, মেথর, বাউল প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষদের নিরাভরণ জীবনের সুষমার প্রতি। অতি অল্প আয়ে, অল্প অর্থে তারা জীবনকে গভীর প্রসন্নতায় কাটিয়ে দিতে পারত। এই আসক্তিহীন জীবনকে শ্রদ্ধা করতেন মণীন্দ্র গুপ্ত –

নিজের অজান্তে তারা ঢেঁকির শাক তুলতে গিয়ে স্পর্শ করে রজস্বলা মাটির সবুজ ভাঁজ, তেলাকুচো লতার সঙ্গে তারা কুড়োয় কিছুটা আগের রাতের শিশির, মেটে আলুর সঙ্গে পৃথিবীর খানিকটা জঙ্ঘা অস্থি তুলে আনে, বনধুঁদুলের সঙ্গে কুড়োয় একটুকু অস্তসূর্যের রশ্মি, স্কোয়াশের সঙ্গে কুড়োয় হঠাৎ ঘনিয়ে আসা দ্বিপ্রাহরিক মেদুরতা, পাকা আম, পাকা তালের সঙ্গে কুড়োয় পুরো গ্রীষ্ম বর্ষার সৌগন্ধ।

মণীন্দ্র গুপ্ত মনে করতেন  প্রত্যেক অস্তিত্বেরই একটি আত্মা আছে। শুধুমাত্র অস্তিত্বের ভেতরকার স্রোতটিকে টের পেতে হবে। কিন্তু সহজে বস্তুর অন্তরের ঐশ্বর্যকে ছুঁতে পারা সম্ভব নয়। এ জন্য কবিকে প্রচণ্ড নিরাসক্ত হতে হবে, বস্তু থেকে যাবতীয় ঐহিক আকাঙ্খার সম্পর্কগুলিকে ত্যাগ করতে হবে তবেই তার অন্তর্মুখী জোয়ারটিকে টের পাওয়া সম্ভব। আকাঙ্খাহীন, কামনাহীন দৃষ্টি যখন বস্তুর ভিতরে প্রবেশ করে তখনই বস্তুটির তাপ আলো ও শৈত্য চেতনার ভেতরে সাড়া জাগায়। বাইরের খোলস আর আবরণ ভেদ করে অপার জীবন রহস্যের সংকেতে দৃষ্টি বাঙময় হয়ে ওঠে। সৃষ্টির এই মহাবৈচিত্রকে ধারণ করতে পেরেছে তাঁর কবিতা –

রাক্ষস আহার করে এই বন। বুড়ো পাহাড়পাথর

লড়ে তার সঙ্গে। অ্যামফিথিয়েটারে বসে রক্তবর্ণ যুবা এইসব দ্যাখে

আর ক্রীড়াভরে তার নীলাভনীলা দাসীকে বাঁকিয়ে বানায় রিং।

মল্লদের চিৎকার ও বাদ্যধ্বনি এত উচ্চগ্রামে

যার কাঁপন হৃদয়ে লাগে শুধু, কান উদাসীন

কিন্তু অন্য শব্দ শোনে

পাতার কিনার যেন বাজনার তার

সেইখানে বাতাস চলকে লেগে যে যন্ত্র বাজায়

তার নাম আলস্য শৃঙ্গার                                       হাণ্ডি খো,

প্রকৃতির বৈচিত্র্যকে অনুধাবন করতে করতে কবি এগিয়ে চলেছেন মাইক্রোতর এক বীক্ষণের দিকে। বিস্ময়াবিষ্ট মহাজগতের রহস্য ও অসীমের প্রকাশের যে নন্দন তার সত্যকে পেতে চান। বাংলা কবিতায় এই পৌরুষ আর অতিলৌকিকতার প্রকাশ নেই বললেই চলে। রহস্যের একের পর এক দরজা কবি খুলে দিচ্ছেন আর পাঠকের চৈতন্যে স্ফুরিত হচ্ছে অনাবিষ্কৃত এক দেশ, অসাধারণ এক ভূগোলের আস্বাদ। উদাসীন, টাটকা, নির্ভেজাল, তন্বী অনুভবের মুখোমুখি হয়ে কবি  পৌঁছে যাচ্ছেন এমন এক সাম্রাজ্যে যেখানে শক্তির উল্লম্ফন নেই, পরশ্রীকাতরতা নেই, প্রতিযোগিতা নেই বরং আনন্দময় পুরুষালি ঔদাসীন্য ও বিশালতায় পূর্ণ সৌন্দর্যের জগতে প্রবেশ করে আদিম জ্যান্তব তারুণ্যকে আলিঙ্গন করে নিয়েছেন-

অসুরসত্তায় জন্ম, সেই জন্য দুঃখে ও কাঁদে না

জাল, বাঁশ, ফাঁদ দেখলে পশু হয়ে আক্রমণ করে;

রাস্তায় বেরিয়ে সব ডিজেলের ধোঁয়া হাঁ করে নিজের মধ্যে গেলে

বাতাস পবিত্র থাক, ওর শুধু ভিতর পুড়ুক                      

                                                                                             নীলকমল, লাল স্কুল বাড়ি

অপ্রাকৃত রসের উৎক্ষেপণে কবির দৃষ্টি এগিয়ে যায় নীলাভ অনন্ত দহনের অভিমুখে। এই দহনের স্পর্শ চৈতন্যে না বাজলে প্রকৃত ধী জন্মায় না। নির্মোহ নির্লিপ্ত দ্রষ্টা হয়ে কবি পর্যবেক্ষণ করে যান সত্তার বিবর্তনের স্তর। পুরুষরূপী প্রকৃতির ‘আমি’ নানা বিভাজনে বিন্যস্ত হয়ে রূপের সহস্র পর্যায়কে সম্ভোগ করে আর সমগ্রকে নিজের মধ্যে গেঁথে নেয়। শুরু হয় দার্শনিক মেধাবী প্রজ্ঞার চলাফেরা। নিজের সম্বন্ধে মণীন্দ্র বলেন “আমি এক হিন্দুবংশোদ্ভুত পিদ্রুসাহেব, তোবড়ানো সোলা হ্যাট মাথায়, দেশে দেশে প্রসপেক্ট করে বেড়াই। দস্যু ও দাসদের মধ্যে ঘুরি, পকেটে গুপ্ত ম্যাপ নিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে রাস্তা খুঁজি। এই দুরূহ দুস্তর জগতে যাদের সঙ্গে আমার দেখা হয়, যে বিষম পরিস্থিতি আমার দিকে ছুটে আসে তাতে আমার জন্মগত সংস্কার ও সম্মোহ অপসৃত হয় – আমি দেখতে পাই কবিতার ভয়ংকর বিশ্বরূপ। যার মধ্যে ক্রূর, মধুর, বিধুর সব সংবৃত হয়ে আছে, তাকে ধারণ করা কোনো ছন্দ মিলের, কোনো বঙ্কিম বা কৃত্রিম ভাষার কর্ম না।“  মণীন্দ্র গুপ্তের সন্ধান এই ক্রূর পেলব, মধুর, কঠিন জগতটির প্রতি যেখানে কবিতার বীজ জন্মে আদিম সোঁদা গন্ধ, সোনালী ছায়া আর চাঁদের শীতল ভূখণ্ডের রহস্যময় সন্নিপাতে –

প্রত্যেক সন্ধায় আমি সন্ধ্যাতারাটির কাছে বাহু তুলে একাকি দাঁড়াই

সেও রোজ নেমে এসে আমার বুকের মধ্যে ভরে দেয় উদাসী ছায়ার অংশভাগ।

সে সময়, অসম্ভব দীর্ঘ হাতে আকাশের বুক ছুঁই –

                       হাত বেয়ে নেমে আসে নীলিমার গহন পরাগ;

মনে হয়, এই শান্তি এ নৈঃশব্দ পরিব্যাপ্ত করে আমি

                                আছি কিংবা নাই।

                                                                                          গহন পরাগ, নীল পাথরের আকাশ

বৃহত্তর অভিজ্ঞতার রঙে, সন্ধ্যার নিহিত অন্ধকারে যে কবিকে বুকের মধ্যে ভরে দেয় উদাসী ছায়ার অংশভাগ তা আসলে মহাজগতের চিরজায়মান ধ্যান। ঐ বিরাট শান্তি আর নৈঃশব্দ কবিকে বৃহৎ সত্যের সম্মুখীন করে,কবি টের পান এ বিরাট বিশ্ব বলয়ে তার ক্ষুদ্র অস্তিত্বের তাৎপর্যহীনতা। তাই শরীর নয় সত্তাই আবিষ্কৃত হয় বিভিন্ন রূপে বিভিন্ন বিন্যাসে। আসলে সার্বভৌম এই নিখিলে ব্যক্তি কণার চেয়েও ক্ষুদ্র মাত্র এই নিখিলেই সে আরো ক্ষুদ্র হয়ে বিলীন হয়ে যায়। শুধু চৈতন্য সেই বৃহত্তরকে সর্বদা অনুসন্ধান করে, স্পর্শ করে। মণীন্দ্র গুপ্ত তাই নিরাসক্ত অথচ ষড়রিপুময় পরিব্রাজক, সমস্ত ইন্দ্রিয় দিয়ে শুষে নেন পঞ্চভূতের উল্লাস। এবং এই সংশ্লেষণ চলতেই থাকে সবার অলক্ষ্যে, অদৃশ্য নড়াচড়া টের পায় কেবল কবির তৃতীয় নয়ন

আলো আঁধারির মধ্যে গাছে হাওয়া হঠাৎ ঘুরছে শব্দ

একপাল লাল বেবুন লাফ দিল চাঁদ লক্ষ্য করে। টুপটাপ ঝরছে শিশির

শব্দ : রঙ্ক হরিণের দল সন্তর্পণে ঘুরে চলে গেল। এইবার

চড়া হাওয়া- ডাল পাতায় টান – শব্দ : বুনো টাবু

কেশর উড়িয়ে আসছে, থমকে যাবার উলটো ছুট

                                                                                        নিসর্গ মুক্তি, লাল স্কুল বাড়ি

কবির লক্ষ্য অপ্রাকৃত পরিবেশ সৃষ্টি; আর এই অপ্রাকৃত রস খুব নির্জন নিঃশব্দ হয়ে পাঠক মনে সৃষ্টি করে তন্ময় এক অবস্থা। প্রকৃতির প্রেক্ষাপট আর প্রাণীদের চঞ্চলতা এ দুয়ের সমাবেশে যে রহস্যের সঞ্চার কবি করতে চাইছেন তা আসলে মনের ভাঁজে জমে থাকা বহুযুগের ক্ষতকে এক ঝলকে প্রতিকায়িত করা যেন বহুদূর থেকে অকস্মাৎ তীক্ষ্ণ তীর উড়ে এসে আমাদের প্রচলিত অভ্যাস আর যাপনের চিত্রকে ওলটপালট করে দেয়। আমাদের প্রত্যাশাগুলিও ঐ ভয়ঙ্কর রসের সান্নিধ্যে দুমড়ে যায়। কবি নির্মাণ করেন ভাষা ও বোধের সম্পূর্ণ এক নিজস্ব জগৎ।  অব ও অধিচেতনার দুই রূপকে নিজেরই গহন থেকে বের করে এনে নিজেই আস্বাদ নিচ্ছেন।  আস্বাদের তুরীয় অবস্থায় ঘটছে মোক্ষলাভ। এই অর্জনের পথে চিহ্ন রেখে যায় ধ্যান ও মনীষা, অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস, প্রেম ও অন্তর্দৃষ্টি। থাকে পরম্পরাকে আত্মীকরণ করে নেওয়ার স্পৃহা-

অবশেষে, যবন সংসর্গে এসে জীবনকে খোলামুঠ

হৃদয়কে খোলাবুক দেখে যেন বেঁচে গেল :

নিয়াণ্ডারটালের শক্ত যষ্টি থেকে ক্রমোদ্ভাসিত হয়ে এই মানুষেরা

আজ এখানে পৌঁচেছে

শীত ও তুষার, বরফ গলানো জল –

তার মধ্যে বন্য মাঠ ভরে এই উজ্জ্বল ক্রোকাস।

একদিন পূর্বপুরুষেরা সোনার ডিমের হাঁস

ধরে নিতে দূর ভূখণ্ডের দিকে গেছে।

আজ অন্য হাঁস পৃথিবীর খাল বিল হ্রদ জলা থেকে

ছেলেমেয়েদের কাছে এসে

শোনায় বিজন গল্প

                                                                         প্রকৃতিলীন, ছত্র পলাশ চৈত্যে দিন শেষ

কবিতাটি সম্পর্কে সুধীর দত্তের অভিমত “দেশ কাল ছাড়িয়ে সভ্যতার সঙ্গে সভ্যতার সংযোগ, অন্তর্প্রবেশ, ঋদ্ধি বৃদ্ধি এবং উত্তরণ’’ আমরা বুঝতে পারি মনুষ্য সভ্যতার বিকাশের স্তরগুলি কেমন করে কবি চৈতন্যের রূপ ও লাবণ্যের খরতায় বিয়োজিত হতে হতে পরম সত্যটিকে ধারণের জন্য এগিয়ে গেছে। এ হল সভ্যতার অন্তর সত্তার খোঁজ, ভেদ ও বিপন্নতার সন্নিপাতে ইতিহাসকে প্রজ্ঞা দ্বারা যাচাই করে নেওয়া। আবার শুধু প্রজ্ঞা বা নির্জ্ঞান নয় মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় সর্বক্ষণ ওঠানামা করে হৃদয়ের পাপড়িগুলি, সহজাত আবেশের সুষমা সেখানে ঢেউ তোলে। ঈশ্বর সম্পর্কে মণীন্দ্র গুপ্তের ধারণাও একেবারে অন্যরকম । তাঁর নিজের অনুভবে –

পথপাশে পড়ে থাকা একটি স্তব্ধ মসৃণ নুড়ি পাথর বাড়িতে এনে গভীর মনোযোগে দেখতে দেখতে অনুভব করতে পারি তার প্রায় ঐশ্বরিক শান্তি, শক্তি ও উদাসীনতা। দোর বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রাচীন মন্দিরের দেউড়িতে বা স্তম্ভের পাশে একলা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে যখন দেখি শালিখ পাখি এসে নাচছে চত্বরে তখন স্নেহশীল ঐ দেবতার সঙ্গে শালিখের বন্ধুতার অস্তিত্ব টের পাই। কোনো অজ্ঞাত গভীর কারণে মূর্তির চেয়ে বিমূর্ত আকৃতিতে – বনের মধ্যে কোনো সমাধিস্থ ঘুমন্ত গাছে, আলোয় অতিরঞ্জিত কোনো সুদূর মেঘে, পাহাড় পাথরের কোনো আলোছায়াময় নিস্পন্দ অংশে রুক্ষ আকাশে মুয়াজ্জিনের চিৎকারের মতো কোনো উঁচু মিনারেট, হাজার বছরের ছায়া- বৃষ্টি- হিমের ছোপধরা অতি নির্জন কোনো দেউড়িতে আমি ঈশ্বরের আবির্ভাব অনুভব করি। আমারও বিশ্বাস নৃসিংহ , কালভৈরব, শিব এঁরা সব স্তম্ভে, বনগর্ভের ছায়াচ্ছন্ন পাথরে এবং জল বয়ে যাওয়া ঝোরায় গা ডুবিয়ে থাকা নুড়িতেই অধিষ্ঠান করেন

ঈশ্বরকে অন্বেষণ নিম্নোক্ত কবিতায় ফুটে উঠতে দেখি –

ঝরো বৃষ্টি, আরো লঘু হও মেঘ,

সূর্যের গোধুলি ছেড়ে আরো উঠি –

তারাদের শীতার্ত আক্ষেপ ছেড়ে আরো উঠি –

নির্বিকল্প বিশাল সন্ধ্যার রেখা;

কোনো স্থির জ্ঞানী ভ্রমে ডুবে আছে

                                                                    মৃত্যুর পরে, ছত্র পলাশ চৈত্যে দিন শেষ

‘স্থির জ্ঞানী’র চিত্রকল্প অদৃশ্য ঈশ্বরের যেখানে উপাসনা আর ধ্যান পুঞ্জীভূত হয়ে আছে। ইন্দ্রিয় ক্লান্তির কারুণ্য যেখানে স্থিরতায় মোচড় নেয়। লঘু ও সূক্ষ্ম হওয়ার কথা মণীন্দ্র গুপ্ত বারবার তাঁর কবিতায় বলেন। যত হালকা, সংযত, নির্বিকার করা যায় মনকে ততই শান্তির ধীর প্রভা এসে আচ্ছন্ন করে শরীর।

 

 মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় এলোমেলো, উচাটন , অদ্ভুত যে সৌন্দর্যের সাক্ষাৎ মেলে তাকে বলা যেতে পারে  ‘grotesque beauty’, “ The term came to be applied to paintings which depicted the intermingling of human animal and vegetable themes and forms.’’ 7. মণীন্দ্র গুপ্ত যে সৌন্দর্যকে আস্বাদন করেন তা অপ্রাকৃত অতিলৌকিক রসের ভেতর দিয়ে নিষিক্ত হয়ে ভৌতিক একটি পরিবেশকে লালন করতে করতে এগিয়ে যায় নিঃশব্দ শান্তির দিকে। শান্তিই তাঁর কবিতায় চিরন্তন অন্বেষণ তা কখনও প্রগাঢ় সুষুপ্তি বা তীব্র জাগরণের সংযোগে কখনও  অতি তুচ্ছ ও আটপৌরে উদ্ভাসকে সঙ্গী করে কখনও গভীর উদাসীনতায় নিমগ্ন হয়ে নিজেকে খনন করে। তাই শুকনো ফুলের ঝরে পড়া, বৃদ্ধের পক্ক কেশ, শিথিল ত্বক, ঘন বনে ঘুঘুর শব্দ, তালবাকলের খসে পড়া, ভাঙা জানালা, সন্ধ্যার মেঘ, পেণ্ডলামের ডিং ডিং দুলে যাওয়ার শব্দ, মিষ্টি ক্ল্যারিওনেটের শব্দ, গোসাপের লেজ প্রভৃতি বিষয়গুলিই অত্যন্ত গুরুত্ব পায় তাঁর কবিতায়। সমালোচকের মতে “মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা পড়ার সময় পাঠক স্বাভাবিক ভাবেই ঝাঁপ দেয় সেই অনিবার্য প্রকৃতি সত্তার শাশ্বতকালীন চিত্রগুলিতে, যেগুলিকে চোখের সামনে দেখেও সে বুঝতে পারে না, এই মাইক্রোদৃশ্যের মধ্যেই আছে ম্যাক্রো মহাজগতের বিস্ময়ের হাতছানি’’ ফলে আমাদের দৃষ্টি এক বিশাল সংযোগ লাভ করে। কবি অর্জন করেন জেন সাধকের দীক্ষা –

জীবন নিজে নিজেই পালটাতে থাকল

              আমি গভীর মনোযোগে শুকনো পাপড়ি দেখি,

শামুকের পিঠের কারুকার্য দেখি, বৃষ্টির ছেঁড়া চালের খড় থেকে

জলের ফোঁটার লাফিয়ে পড়া দেখি।

বাঁশপাতা উড়ে উড়ে উঠোনে পড়ে,

                         ঝরনার জল পড়ে

দীর্ঘ বা ক্ষণিক কোনওরকম জীবনের জন্যই আমি আর

                  কোনও খেদ অনুভব করি না।

                                               কৌটো বাদামের কৌটোয় রাখা মসলিন, টুং টাং নিঃশব্দ

এই বাচনে রিক্ততা নেই, দুঃখ নেই বরং সমস্ত দুঃখজয়ের স্নিগ্ধতা কর্কশ হাহাকারকে চূর্ণ করে। আজকের ডটকম শাসিত, সোস্যাল মিডিয়া পরিচালিত সভ্যতা এই নির্ভার স্বচ্ছতা ও সন্তুষ্টি দেখে আঁৎকে ওঠে। এর অন্তর্নিহিত নীরবতা আমাদের প্রমত্ত চিৎকারগুলিকে ছিঁড়ে দেয়, জীবনকে ভেতর থেকে চেনায় ভালোবাসতে শেখায়। খুব সহজ ও সাদাসিধে ভাবে জীবনকে দেখেন বলেই বস্তুর অন্তরে বস্তুর প্রকৃত রূপের সন্ধান পান, এই ধর্মে তিনি ঈশ্বরকেও পেয়ে যান। বিশাল বিশ্বসংসারের স্বরূপ যিনিই উপলব্ধি করতে পারেন তিনিই তো ধার্মিক তিনিই তো চৈতন্যময়। সামান্য পড়ে থাকা শুকনো তৃণখণ্ডে যিনি মহারহস্য মহাসৌন্দর্যকে ঝুঁকে থাকতে দেখেন তিনিই পূজারি। প্রেমের এই প্রত্যয়ে মণীন্দ্র গুপ্ত যথার্থ সাধক।

 

মণীন্দ্র গুপ্ত একজন যথার্থ চিত্রশিল্পীও। তিনি কবিতায় ছবি আঁকেন, রঙের উদ্ভাস ঘটান। এজরা পাউণ্ড বলেছিলেন এমন কিছু অনুভূতি আছে যা ছবিতেই ফুটিয়ে তোলা যায়। এবং তিনি চেষ্টা করতেন জটিল অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাগুলি ছবির মতো করেই কবিতায় ফুটিয়ে তুলতে। মণীন্দ্র গুপ্তও ছবি আঁকার চর্চা বহুকাল ধরে করে এসেছেন। তাঁর কবিতায় এসেছে ইম্প্রেসনিস্টদের মতো বাস্তবের গোলোযোগ থেকে দূরে প্রকৃতি, নদী, পাহাড়ের নির্জনতাকে ফুটিয়ে তোলার প্রেরণা। প্রকৃতির সৌন্দর্যমুগ্ধতার পাশাপাশি এসেছে অবচেতনার বিচিত্র লীলাকে অঙ্কনের প্রয়াস –

ফোঁপরা এই পাহাড়ে আমরা কজন কবি থাকি,

এক-একজনের এক-একটি গর্ত।

হঠাৎ ঘনিয়ে ওঠে কাঁচা বাতাসের নীল নীল স্তম্ভ,

তাদের মধ্যে ঢুকে সূর্যের কমলা হলুদ জটা

দীর্ঘপত্র ইকড় ঘাস হয়ে জন্ম নেয়

তারা আসলে বহুদুরের খবর ধরার অ্যান্টেনা।

সেই উঁচাইয়ে সেঁটে আছে এই মৌচাক

                                                                কয়েকজন কবি, ছত্র পলাশ চৈত্যে দিন শেষ

বিবৃতিমূলক কবিতাটিতে প্রাধান্য পেয়েছে ছবি আঁকার ভাব। কবি যেন নিপুণ চিত্রকরের তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন পাহাড়, বন, সূর্য, বালুচর, ঘাস। আমাদের চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে দুলে উঠছে কাঁচা বাতাসের নীল স্তম্ভ, সূর্যের কমলা হলুদ জটার বর্ণমালা, দীর্ঘপত্র ইকড় ঘাসের লাবণ্য। মণীন্দ্র গুপ্তের আত্মজীবনী থেকে জানা যায় রঙের সান্নিধ্যে থাকতে কবি খুব ভালোবাসতেন। রঙের অন্তর্গূঢ় বিচিত্র চরিত্র কবিকে সৃষ্টির প্রেরণা জোগাত। দুর্গামণ্ডপে প্রতিমা গড়ার সময় বালক মণীন্দ্র একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন প্রতিমার পাশে বাটিতে রাখা তাজা দেশি রঙের দিকে। রঙের বিদ্যুতে জেগে উঠত কিশোর মন –

 দুর্গার গায়ে হলদে পাখির গাঢ় হলুদ, অসুরের গায়ে পাতাল শৈবালের ঘন সবুজ, বিজয়ার গায়ে গোলাপী দোপাটির কুসুমরাগ, জয়ার গায়ে শ্বেতপদ্মের আভা,  শাড়ি আর কাঁচুলির কাঁচা সবুজ, গভীর বেগুনি, ঘোর লাল অপরাজিতা নীল – মূর্তির উপর কুমোরেরা তুলিতে ভরে এইসব রঙের পোঁচ দেয় আর আমি অবাক হয়ে দেখি সাদা জমি যেন রঙের বিদ্যুতে ভরে উঠেছে। সারি সারি মাটির সরায়, এনামেল বাটিতে কুমোরদের আঙুলে গোলা ঐ রঙ আমাকে জাগিয়ে দেয় – রঙের ঘন লাবণ্যের মধ্যে ক্রূরতা, পেলবতা, তেজ, অন্ধকার – যেন পাত্রে পাত্রে আদিবীজ টৈটুম্বর হয়ে আছে।

আমরা বুঝতে পারি রঙের ঘনিমায় নিশ্চুপ হয়ে থাকা দহন আর তেজ কবির ভেতরের রঙকে অজানা আহ্বানে বের করে আনত। দেবী প্রতিমার গায়ের মতোই কবির মনের সাদা জমি অজস্র  রঙের বিদ্যুতে ভরে উঠত, জেগে উঠত অচেনা সাড়াতে ছোট্ট অন্তঃপুর। পরবর্তী কালে কবিতায় রঙের লালন তীব্র হয়ে ধরা পড়েছে।

 

মণীন্দ্র গুপ্ত প্রকৃতই সাধক কবি। তিনি সচেতন নির্মাণে বিশ্বাসী ছিলেন। ধৈর্য, শ্রম, অধ্যবসায় আর বহুপঠন তাঁর কবিতাকে দিয়েছে আলাদা দ্যুতি। মেদহীন, ছিপছিপে কাব্যভাষার মৌলিকতায় পাঠক চমকে যান। দেবারতি মিত্রের অনুভবে ‘’এইরকম স্বতন্ত্র, উজ্জ্বল, শুধু পুরুষের ধমনীর ধকধক শব্দ বাংলা কবিতায় অপরিচিত’’১০। পুরোপুরি আধুনিকও মণীন্দ্র গুপ্তকে বলা যাবে না। আধুনিকদের আত্মকেন্দ্রিকতা , ব্যক্তিসর্বস্বতা তাঁর কবিতায় নেই। সাম্যবাদের হুজুগ আর তত্ত্বের কোন্দলে তিনি বিশ্বাসী নন। প্রকৃতিকে তীব্রভাবে ভালোবাসার ফলে নিজের সত্তাকে তুচ্ছ আর সরল করে নিতে পেরেছিলেন। চোখে না পড়া জগৎ ও জীবনকে তিনি কাব্যবোধে জারিত করেছেন, সমাহিত সন্ন্যাসীর মতো জীবনকে অনুভব করেছেন। ধ্যান, প্রজ্ঞা, মনীষার দীপ্তিতে স্নাত হয়ে  তাঁর কবিতা জীবন, সভ্যতা, বিশ্বরহস্য আর চৈতন্যের বিচিত্র প্রকাশকে প্রতিকায়িত করে। সেই নৈঃশব্দ আর নিভৃতির ছটায় নত হয়ে আসে পাঠকের অন্তর।


তথ্যসূত্র

 ১) পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়, ভূমিকা, ‘’বাংলার তন্ত্র’’, বেঙ্গল পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, আশ্বিন ১৩৪৯, পৃ – ছ

২) মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘’অক্ষয় মালবেরি’’, অবভাস, কলকাতা, মার্চ ২০১৮, পৃ- ৬০

৩) মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘’পরবাসী, কুড়ানী ও দারুনা সান’’, গদ্য সংগ্রহ- ১, অবভাস, কলকাতা, সেপ্টেম্বর ২০১৩, পৃ – ১৪৪

৪) মণীন্দ্র গুপ্ত, কবিতার দেশ দেশান্তর, ‘’চাঁদের ওপিঠে’’, গদ্য সংগ্রহ-১, অবভাস, কলকাতা, সেপ্টেম্বর, ২০১৩, পৃ – ৪৪

)সুধীর দত্ত, মহারাজ হর্ষবর্ধন ও কবি মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘’আদম- মণীন্দ্র গুপ্ত সংখ্যা’’, সম্পাদনা- গৌতম মণ্ডল, কৃষ্ণনগর, চৈত্র ১৪২৪, পৃ – ১০৭

৬) মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘’পরবাসী কুড়ানী দারুনা সান’’, গদ্য সংগ্রহ -১, অবভাস, কলকাতা, সেপ্টেম্বর২০১৩, পৃ- ১৩৮

7) J. A. Cuddon, ‘’Dictionary of Literary Terms and Literary Theory’’, Penguin Books, London, 1999, p – 367

৮) হিন্দোল ভট্টাচার্য, ধর্ম, প্রেরণা, প্রকৃতি এবং কয়েকজন চিত্রকল্প শিকারি, ‘’কৃত্তিবাস’’- সম্পাদনা- স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়, কলকাতা, এপ্রিল-জুন ২০১৮, পৃ- ১১৯

৯) মণীন্দ্র গুপ্ত, ‘’অক্ষয় মালবেরি’’, অবভাস, কলকাতা, মার্চ ২০১৮, পৃ – ৫৫

১০) দেবারতি মিত্র, মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতা ও জীবন, ‘’উত্তরাধিকার – প্রসঙ্গ মণীন্দ্র গুপ্ত’’, সম্পাদনা- বিজন রায়, বর্ধমান, অগ্রহায়ন ১৪০৫, পৃ – ৩৩


ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যোগাযোগ ও লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ spartakasmagazine@gmail.com

  একটি লড়াকু পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্জিত ...