কবিতাঃ দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বাংলা নামের দেশটিকে

প্রথমে তোমার নাম বদলাও। বাংলাদেশ নামটা তোমাকে মানায় না।

রাখো- ইয়া হিয়া মুলুক, কিংবা ওই রকম কিছু একটা।

তারপর বদলে ফেল পতাকার রঙ।

ওই গাঢ় সবুজ সবুজ সারল্য তোমার হারিয়ে গেছে কবেই।

 

এইবার একুশে ফেব্রুয়ারিকে আর শহিদ দিবস বোলো না।

এবার থেকে নাম হোক ভাষা-বিজয় দিবস। কেন না, ওই দিন থেকে

তোমার রাষ্ট্রভাষা হবে আরবি।

বাংলা নিষিদ্ধ হোক তোমার মাটিতে। সঙ্গে, সঙ্গে

মুছে যাক নজরুল, জসীমুদ্দিন, লালন শাহ, হাসন রাজা, গগন হরকরার নাম।

ধুলোয় মিশিয়ে দাও বিজয় গুপ্ত, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু-প্রতিভা বসুর ভিটে

 

ভারতীয় হিন্দু কবির লেখা সোনার বাংলা গান থেকেও মুক্তি নাও তুমি।

 

বলো- একুশে একটা দুঃস্বপ্ন। বলো- মুক্তিযুদ্ধ একটা ধোঁকা।

বলো- এই আদিগন্ত ধানক্ষেত, এই আমবন, এই মায়াময় চলনবিল, হাওড়-

এসব তোমার চাই না।

 

তোমার আত্মগঠনপর্ব সুসম্পূর্ণ হলে একবার তোমার কাছে যাব। দেখব-

মরুভূমির চিকন বালিতে কেমন হেসে উঠছ তুমি। আর হাসছে

শুকনো বালিতে ছড়িয়ে থাকা মালাউনদের হাড়।।

 

সুজিত

 ছিয়াশি বছর বয়সে মেয়ে, জামাই, নাতি-নাতনি, বেয়াই-বেয়ান সবাইকে ডেকে, সবাইকে যথাযোগ্য আশীর্বাদ করে সুজিতের বাবা একদিন মারা গেলেন। গোটা পাড়া সেদিন হুমড়ি খেয়ে পড়ল সুজিতের বাড়ি। সেখানে তখন করুণ-মধুর বিদায়দৃশ্যঃ সুজিতের মা নিথর বসে আছেন স্বামীর হাত ধরে; তাঁর গায়ে লেপ্টে আছে কিশোরী পৌত্রীটি। দেয়ালে হেলান দিয়ে এক একবার ডুকরে উঠছে প্রৌঢ়া কন্যারা। সুজিতের স্ত্রী বৃদ্ধের পায়ের কাছে বসে নীরবে কেঁদে চলেছে।

 

সুজিতের তেমন কোনো কাজ নেই। মাঝে মাঝে পার্স খুলে একে ওকে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কেউ বড় একটা নিচ্ছে না, রাখো রাখো পরে দেখা যাবে বলছে। যাবতীয় আচার সেরে একসময় বাবাকে কাঁধ দিতে এগিয়ে এলেও দরজা পর্যন্ত যাওয়ার পরেই পাশের পাড়ার মলয় এগিয়ে এসে তাকে সরিয়ে দেয়। সুজিত হেঁটে হেঁটে চলে। পেছনে দিদি-বোন-মা- স্ত্রীর কান্নার শব্দ। তার হাত ধরে সহকর্মী বিবেকবাবু।

 

ধূপ, ধুনো ফুল আর হরিধ্বনির মধ্যে চিতা জ্বলে। মনে হয় আগুনের দোলায় চড়ে বাবা কোন আনন্দের দিকে রওনা হলেন। জ্ঞাতিভাই মোহন শ্মশানের নিয়ম মেনে সেখানে বসেই শ্রাদ্ধাদি কাজের কিছু কথা শুরু করে রাখে। এত মানুষের সমাগমে সুজিতের বিহ্বলভাব কেটে গেছে ততক্ষণে। বয়স্কদের চোখ এড়িয়ে সেও একটা সিগারেট জ্বালায়।

 

না, এবার আর সুজিত একা-একা বাবাকে শ্মশানে নিয়ে এসে ছাতাহীন বৃষ্টিতে ভেজেনি।


ছবিঃ অনুষ্টুপ লাই

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যোগাযোগ ও লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ spartakasmagazine@gmail.com

  একটি লড়াকু পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্জিত ...