থিয়েটার থেকে বলছিঃ উদয়শংকর মুখোপাধ্যায়ের ধারাবাহিক গদ্য

 



পিগমিদের দেশ

 তখন আমার দল বর্ধমান প্রয়াসের প্রযোজনা "সওদাগরের নৌকা" র প্রযোজনার প্রস্তুতির কাজ চলছে জোর কদমে।

মহড়া, সেটের কাজ, আবহ নির্মাণের কাজ সব কিছুই। সব মিলিয়ে প্রচন্ড পরিশ্রম চলছে...

আবহ নির্মাণ করছিলো রাতুলদা...

ঐ সময়ে আমি একদিন ফোনের সুইচ অফ করে ঘুমিয়ে পরেছি রাতে...

সকালে ফোন খোলার সাথে সাথে একটা টেক্সট মেসেজ ..."শালা আমায় পাগল করে দিয়ে পোঁদ উল্টে ঘুমুচ্ছো?".......রাতুলদার মেসেজ।

মেসেজটা পড়ে হাসছি প্রবল,সাথে অনুতাপও হচ্ছে ফোন অফ করে ঘুমানোর জন্য।

 সকালে ফোন করতেই আবহ নিয়ে তীব্র আলোচনা, বিতর্ক, ভয়ংকর গালাগাল

শেষে আবহ রচনা....

 

নাট্যভূমি তখন থিয়েটারের আকাশে এক্কেবারে সদ্য এক কিশোর। আমরা মাত্র কয়েকজন কর্মী, সদস্য, অভিনেতা।

নাট্যকার নির্দেশক রাতুল চক্রবর্তী।

 তার আবার সদ্য বিয়ে হয়েছে। "পোষ্টমর্টেম" তখন বাজারে হিট প্রযোজনা। তো দলের অনেকেরই ইচ্ছা টাউনহলে বার্ষিক অনুষ্ঠান করার। কিন্তু দলের ভাঁড়াড়ে মা ভবানী। হল বুকিং হবে কিভাবে? একমাত্র চাকুরে দলের নির্দেশক... তবে আফটার ম্যারেজ সকলের মতো তারও পকেট গড়ের মাঠ। তাহলে হবেনা অনুষ্ঠান? সবাই চিন্তিত। সাথে নির্দেশকও। টাকা আসবে কোন উড়োপথে??? কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে অবশেষে নির্দেশক এই অধমের হাতে তুলে দিলো সদ্য বিয়ের সোনার আংটি জুয়েলারির দোকানে বন্ধক দেওয়ার জন্য। অগত্যা আংটি দেওয়া হলো বন্ধক। বার্ষিক অনুষ্ঠানের পথ হলো মসৃণ। তিনমাস পর সুদসমেত বন্ধকের আমানত জমা করে ফিরে এলো আংটি।

 নাট্যভূমির পথচলা শুরু হলো টগবগিয়ে।

 

গভীর রাতে নিজের দলের প্রাক্তন অভিনেতার তৈরী থিয়েটারের দলের প্রযোজনার আবহের হৃদয়ে প্রবেশ করে ছাড়খার হয়ে যাওয়া কিংবা পরম আদরের মূল্যবান কাঞ্চন অপরের কাছে থিয়েটারের জন্য গচ্ছিত রাখার মতোই জীবনকে থিয়েটারের মঞ্চে বাজী রাখতে পারা তো যার তার কাজ নয়।

অমিতাভ বচ্চন অভিনীত " ম্যয় আজাদ হুঁ " সিনেমার শেষ দৃশ্যটা বার বার মনে পড়ছে....

সাজঘরে রঙ মেখে  রাজা সাজতে সাজতে কখন যে নকল পোষাক আসল হয়ে যায় সেই মাহেন্দ্রক্ষণের হদিশ পায় কজন?

জীবন তো পদ্ম পাতার জলের মতো। টুপ করে খসে পরলেই হলো। তবু সে জলে কত মণি মুক্তো জড়িয়ে লুকিয়ে থাকে, আবরনের খোলশ ছাড়ালে তা দেখা কি অতই সহজ?

বর্ষার ফলার মতো সজীব স্বপ্ন বারংবার বিদ্ধ করতে করতে শিরা উপশিরা বেয়ে মাথার মধ্যে যখন প্রবেশ কোরে থিয়েটারি বোধে করে আঘাত, তখন শাদা পাতায় গোটা গোটা সোনার অক্ষরে লেখা হয়ে যায় পান্ডুলিপি...

" আমিতো মৃত্যু চাইনি...বরং মৃত্যুই চেয়েছে আমায়...

চেয়েছে আমার চেতন, অবচেতন,  দুঃখ, সুখ, কান্না হাসি, শোক, তাপ, যৌনতা, আমার সব টুকু অসহায়তা,আমার না-বলা যা কিছু, না-হয়ে ওঠা সব সবকিছু...আমার অশ্বমেধের ঘোড়া।

যে সংলাপ রচনায় ক্ষতবিক্ষত হতো মঞ্চের এ-কোণ থেকে সে কোণ আমার মৃত্যু তার কাছে এতো ছোট যে দূরবীন চোখে রেখেও যায় না দেখা তাকে।

সেই সংলাপের পিঠে রেখেছি দূরবীন...কখন যে সে টেলিস্কোপ হয়ে তারা খুঁজছে আকাশের গায়ে বুঝিনি তা আগে। ভ্যান গঘের গম ক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে রবি ঠাকুরের যখন পড়বেনা মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে গাইতে গাইতে কখনো বলতে পেরেছি শালা অভিনয় তো জানে একমাত্র আঙুর আর বাকিরা জলে আঁক কাটে?...বাংলার গ্যারিকের বজ্রধ্বনির সংলাপ সাহেব তোমরা এ দেশে এলে ক্যানে ঐ যে বেজে চলেছে জলে মাছের সাঁতারের শব্দের মতো...শব্দেরা বাজছে... বেজেই চলেছে...কানের কাছে...দামামা হয়ে....

 

এখন আমার সামনে একটা উঁচু টিলা। ঠিক তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে রাতুলদা। এটা যেন পিগমিদের দেশ। কৃষ্ণচূড়া গাছে ভরে আছে চারিধার। আর আছে রাধাচূড়া। কোথাও কোথাও জারুল। জারুলের পাতায় উঁকি দিচ্ছে সোনালী রোদ। হঠাৎ ভেসে এলো শালফুলের মাতাল করা গন্ধ। সে গন্ধ জড়িয়ে গেলো রাতুলদার চোখে, মুখে,গ্রীবায়। বাড়ালো দুবাহু আমার দিকে। এগোলাম আমি একটু একটু করে। শালফুলের গন্ধে ভরে যাচ্ছে চর্তুদিক। এগোচ্ছি আমি। জারুলের ভিড়ে। এগোচ্ছি। রাধাচূড়ার ঝোপে। আরো এগোচ্ছি। এবার কৃষ্ণচূড়ার মিছিলে। মাতাল হয়ে যাচ্ছি শালফুলের সুবাসে। এগোচ্ছি। একটা ঘোরে এগোচ্ছি...এগোচ্ছি...

না...

দাঁড়ালাম আমি

উঁচু টিলার উপর রাতুলদা। শ্রী রাতুল চক্রবর্তী।

এখন  শালফুলের সুবাস নেই

নেই কৃষ্ণচূড়া

রাধাচূড়া নেই

নেই জারুলও...

উঁচু টিলা...শ্রী রাতুল চক্রবর্তী... আর পিগমিরদের দেশ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যোগাযোগ ও লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ spartakasmagazine@gmail.com

  একটি লড়াকু পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্জিত ...