মিঞার বেড়
শ্রাবণের শেষ থেকেই গমগম করে বনকাপাশি গ্রাম। স্টেশনেও ব্যস্ততার শেষ নেই। ডাউন কাটোয়া লোকালগুলোতে নামে বোঝা বোঝা শোলা। সেই শোলা চালান হবে শিল্পীদের বাড়ি বাড়ি। তৈরি হবে প্রতিমার ডাকের সাজ। শেষ ভাদ্রের একদিন তিনটে কুড়ির লোকাল ঢুকতেই ছুটোছুটি পড়ে গেছে। ছেলে ছোকড়ার দল শোলা নামালে উঠলাম ট্রেনে। একটা শোলার বোঝায় ঠেস দিয়ে বসেছিল একটা বুড়ি। সাদা শোন পাকানো চুল আর কুচকে যাওয়া চামরা বলে দিচ্ছে বুড়ি সত্তর পেরিয়ে গেছে। ‘মাসি শোলা ছাড়’ বলে টান মারতেই মাসি একটু হেলে গেল, ট্রেনের মেঝে তে পড়েই যেত যদি না ধরতাম। গোটা ট্রেন তো ফাঁকা তাও কেন বুড়ি মেঝেতে বসে? কাপড়ের খুট থেকে মুড়ে যাওয়া টিকিট টা আমাকে দেখাল টিকিট চেকার ভেবে। ‘আমি টিকিট দেখার লোক নই মাসি। চল ওই সিট টাতে বসো।’ ‘এটা ছিটে বসার টিকিট বটে তো বাপ’, ‘কেনো না ? চল ওখানে বসো।’ থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে লাঠিটা কে ভাল করে মেঝেতে চেপে আধখানা উঠে সিটের ধারে বসলো। ফোনটায় আর আঙুল ঘোসতে ভাল লাগছিল না। শরতের পড়ন্ত বিকালে উপরে নীলাকাশ নিচে সাদা কাশ, মাঝে মাঝে আকাশে সাদা পেঁজা মেঘে সোনালি আস্তরণ কখনো হাতি কখনো নটরাজ কখনো অর্জুনের রথ, কখনো পাঞ্চজন্য বাদনরত কৃষ্ণ নানান আকার মোবাইলের ফাইলে ঢুকছে। সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বিভিন্ন গ্রুপে আপলোড হয়ে যাচ্ছে। অজস্র আঙুলের পছন্দস্পর্শ পেরিয়ে নিজেকে এলেমবাজ ফটোগ্রাফার ভাবার জন্য মোবাইল টা পকেটে রাখলাম। তেরচা অবস্থানে বসে থাকা বুড়ির দিকে নজর যেতেই দেখি বুড়ি কিছু বলতে চাইছে আমায়। বারবার ঠোঁটদুটো অস্ফুট ভাবে নড়ে উঠছিল।‘কিছু বলবে মাসি ?’ ‘হ্যাঁ বাপ চামারদিঘি স্টেশন টা এলে একবার বলে দিও মানিক।’ আচ্ছা। নির্জন কামরা, সাকুল্যে গোটা কতক লোক, ভিড় হবে দুটো স্টেশন পর। বুড়ির সঙ্গে দুটো কথা বলে সময় কাটুক না। বুড়ি যে ভিখারি নয় সেটা ওর খুটে বাঁধা টিকিটই বলে দিচ্ছে। ‘কোথায় গেছিলে মাসি?’ ‘আর বলিস কী বাপ, যেখানে থাকি সেখানকার নোক বলে একটা সার্টিপিট দরকার। বোলোকে গেইলাম বললে পুরনো রেসন কাডটা লিয়ে এসো থাইলে একটা সার্টিপিট করে দোবো। আমি তো এখানকার নোক লই, গোয়ালপাড়া আদি বাড়ি তাই পাটির ছেলেরা বললো হেইখেনে একবার খুঁজে আসতে তাই গেইলাম।’ বুড়ি গ্রামের নাম আর মৌজার নাম ছাড়া অঞ্চলের বা ব্লকের নাম জানে না। এখন যেখানে থাকে সেই জায়গার নাম মল্লিকপুর আর মৌজার নাম মিঞার বেড়। এই মৌজার নামটা আইনালের বাপ বলে গেছিল। আইনালরাও খুব উঁচু বংশের। অবস্থার বিপাকে তাদের ভিখিরি দশা। আইনাল দের পুর্বপুরুষরা বেশ দাপটের সঙ্গে এই মৌজায় বাস করত। তারপর কী হল ওদের অনেকেই চলে গেল দেশ ছেড়ে আর ওই দেশ থেকে এল কিছু মানুষ, বাস করতে লাগলো আইনালদের জায়গায়। ‘আইনালের বাপ বলেছিল জোত জিরেত ছেড়ে কোথাও যাব না, ওই একই দেমাকের জনকয়েক মিঞার পুতরা থেকে গেল। এখন হিদুরাই বেশি থাকে। কিন্তু মৌজার নাম মিঞার বেড়ই রয়ে গেল। ওই গাঁ খানাকে বেড় দিয়ে ঘিরে আছে হিদুর সত্যনারায়ন আর মোছরমানের পীড়। কেউ কেউকে সন্দেহ করে না খুব মিলমিশ। আর আইনালের দেখাশুনোতে বেঁচেবর্তে আছি এখনো।’ আইনালের সঙ্গে বুড়ির সম্পর্ক অনেকদিনের। ‘ওর বাপ তিননম্বর বিয়ে যখন করে আইনাল তখন চোদ্দ। ওর নিজের মা, ছানা দুধ ছাড়ে নাই তখন মরে। দুনম্বর মাও খুব ভালোবসতো আইনালকে। কী যে হল রাগের মাথায় তালাক খেলে, তারপর যে বাপের বাড়ি গেল আর এমুখো হয় নাই কো। এই তিন নম্বর কে আইনাল মানতে পারছিল না কিছুতেই। একদিন কেউকে কিছু না বলে সোজা ঘুরতে ঘুরতে গোয়ালপাড়া। একদিন সকালে উঠে উঠোনে ছড়ো মারুলি দিতে যাব দেখি কি দাওয়ায় শুয়ে আছে একটা ছোট ছেলে। তারপর থেকে অকাল বেধবার সহায় হয়ে গেল। জাত নুকোবার চেষ্টা করি নাই কো, একদিন যদি সবাই সত্যিটা জেনে যায়। রণজিৎ বাঁড়ুজ্যের বাড়িতে মান্দারি নাগিয়ে দিলাম। গাঁয়ে এই নিয়ে গুঞ্জন কম হয় নি বাপ। কিন্তু আমাকে কেউ চটাতে সাহস পায় নাইকো। কারণ এই নক্ষী হাজরা কে আপদে বিপদে অনেকেরই দরকার যে। কার বাড়িতে কোনো বউ ঝির পোসব বেদনা উঠলেই ডাক পরে এই নক্ষীর। সারা সারা রাত জেগে খালাস করে তবে ঘর ঢুকি। খানিক ক্ষণ থেমে আবার শুরু করল বুড়ি, ‘আইনালের বছরচুক্তির টাকা, আর আমি লোকের ধান সেদ্দ করে শুকিয়ে ঢেঁকি তে মেরে গেরস্ত বাড়িতে দিয়ে আসি তার থেকে যা আসে, কারো বাড়িতে বিয়ে থা অন্নপ্রাশন পৈতে মোছরমানদের খতনায় একটা ধাইমার সিদে পেতাম, এই সব করে চলে যেত দুই মা বেটার।’ হিন্দু মুসলমান মিলিয়ে প্রায় শতাধিক সন্তানের প্রসব করিয়েছে বুড়ি। এর জন্য লক্ষীর গর্বের সীমা পরিসীমা নেই। বুড়ি আবার শুরু করে ‘ এই ভাবেই বেশ চলে যাচ্ছিল বাপ, ফেসাদ হল একদিন। গাঁয়ের কিংকর চাটুজ্জের বাড়িতে ডাকাতি পড়ল। ঝড় বাদলার দিন রাস্তা ঘাট অন্ধকার। কাদের যেন পাঁচবেটারি লাইটের আলা আকাশ পানে ঘুরছিল বারবার, আইনাল তাই দেখে অবাক। এত আলা কোথা থেকে এল। তারপর অনেক পরে রেতে যখন শুতে যাব তখন বোমা ছুড়তে ছুড়তে ডাকাতরা পালিয়ে যেচে। বুঝলাম গাঁয়ে ডাকাতি পড়েচে।’ গ্রামের মানুষের নানান সন্দেহের মধ্যে একটা সন্দেহের তীর অবধারিত ভাবেই গেছিল বুড়ির পোষ্যের দিকে। গ্রামের সবাই ভাবতে লাগলো আইনালই বাইরে থেকে লোক আনিয়ে এই কাজ করিয়েছে, বুড়ি বলতে লাগল ‘বিশ্বাস কর বাপ, আমার আইনাল তার কিছুই জানত না। তবু আমাদিগে গোয়ালপাড়া গাঁয়ের পেরাই নোক সন্দেহের চোখে দেখতে নাগল। তার কিছুদিন পর, আর একটা ঝড় বাদলার রেতে মা বেটাতে ঠান্ডা ভাত ছাতুমাখা নঙ্কাপেয়াজ দিয়ে সবে খেতে শুরু করেচি, ওমনি দরজায় ধাক্কা, নক্ষী, নক্ষী রে একবার আমাদের বাড়ি যেতে হবে, বৌটার পোসব বেদনা উঠেছে। দরজা খুলে দেখি উত্তর পাড়ার নরেশ মোড়ল। চিমনি আলাটা নিয়ে মোড়লের সঙ্গে এগিয়ে গেলাম। বাচ্ছা খালাস করে আসতে ভোর হয়ে গেল। ফিরে এসে দেখি আইনাল থরথর করে কাঁপছে। পাড়ার ছেলেরা ওকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুব মেরেচে। আমাকে দেখে খুব কাঁদল মানিক আমার। তারপর ঠিক করে ফেললাম এগাঁয়ে আর থাকব না। একদিন রেতের অন্দকারে গাঁ ছাড়লাম। খুব মন খারাপ হয়েছিল বাপ, সোয়ামি শ্বশুড়ের ভিটে ছেড়ে যেতে। যে গাঁয়ে কত মায়ের পোসব যন্তনা কমিয়েচি, সেই গাঁ আর একটা মায়ের যন্তনা বুঝলো না? তাই রাগে সেই গাঁয়ের কোনো কিচুই নিই নাই কো। ভোরের বেলা ছোটলাইন টেন ধরে চামারদিঘিতে নেমে মল্লিকপুরে এলাম। এতদিন পর আইনাল কে পেয়ে বাপের আর আনন্দে ধরে না। শুনল সব বেত্তান্ত। তারপর আইনালদের ঘর লাগোয়া একটা জাগাতে একটা বাতা মাটির একচালা ঘরে থাকতে লাগলাম। অনেকদিন পর রেসনের কাগচ টার লেগে ওই গাঁয়ে আবার গেলাম। চামারদিঘি আর ক’টার পর বাপ?’ বললাম আরও একটু দেরি আছে মাসি। এতদিন পরে যে গ্রামে গেলে কারও সঙ্গে দেখা সাক্ষাত হয়নি ?’ ‘হ্যাঁ সে আর বলতে পুরনো মানুষ যারা তারা ঠিক চিনেচে, ছেলে ছোকড়ারা চিনবে না, সে পেরাই এক কুড়ি ছ বছর হয়ে গেল গোয়ালপাড়া ছাড়া। ঠাকুরপুকুরের ঘাটে হাত পা ধুয়ে ভাঙাঘর পানে যাবো আর রাস্তায় সামনা সামনি দেখা নরেশ মোড়লের বৌয়ের সঙ্গে, আর যায় কোথা, দিদি বলে জড়িয়ে ধরলে ‘এতদিন পর এ গাঁকে মনে পড়ল ? সেই যে গেলে আমাদের গাঁয়ের পেরাচিত্তিরটা করতে দিলে না? চল দিদি আমাদের ঘরে চল।’ মোড়লগিন্নির সঙ্গেই একবার ভিটেটা ঘুরে গেলাম। ভিটের আর কিছুই নাই। ওই মাটিতেই খানিক ক্ষণ বসলাম। মনে খুব আশা ছিল কেউ যদি আমার ফেলে যাওয়া রেসনের কাগচটা রেখে দেয়। না। জানতে পারলাম কেউ নাকি আমার জিনিষ ছোঁয় নাই, আইনালের লেগে। আশপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরে কতজনা কত কথা জানতে চাইছে। কেনে গাঁ ছাড়লাম সেই কথাই বেশি। এখন যে গাঁয়ে থাকি সে গাঁ কেমন, এইসব। চোখ দিয়ে শুধু জল গড়িয়েই যায় আর মেয়েরা চিনুক না চিনুক তারাও কাঁদে। এত ভালবাসা এই বিধবা বুড়িটার জন্যে এই গাঁয়ের জমা ছিল জানতাম না। মোড়ল গিন্নি ওর বাড়ি নিয়ে গেল। চান করলাম। লতুন কাপড় পরতে দিল। ওটা আর ফেরৎ লিলে না। ছোট বুনের মত আদর যত্নআত্তি করলে। শুধোলাম হা রে বুন যাকে খালাস করালাম সেই বেটা টা কোই ? সেই আমার শেষ পোসব করানো বল? মোড়লগিন্নি বলল সে এখন মস্ত বড় অপিসার। খুব আনন্দ হল। বললাম, কি অসইরণ কতা বল দেকি, দেশে থাকতে গেলে আবার বলচে কাগচ লাগবে। তা তোর অপিসার বেটার সারটিপিট আছে তো,বাইরে থাকে বলচিস। মড়ল গিন্নি হেসে বলল সেই নাকি সাবাই কে সারটিপিট দেয়, গিন্নির হাত দুখান ধরে বললাম নিসচিন্তি হলাম রে বুন যাকে খালাস করেছি সে যদি দেশে থাকতে পারে তাহলে আমাকে তাড়ায় কে? বুনও হা হা করে হাসল। মনে মনে ভাবলাম একদিন এই গাঁ সন্দেহের চোকে দেখত আজ দেশ দেখচে সন্দেহের চোকে মনে হচে। দেকলে দেকুক না,আমি যে এগাঁ ওগাঁ মিলিয়ে কতজন কে খালাস করেচি তার কোনো দাম নাই ? কতজনের আমি ধাইমা। তাদের মায়ের চেয়ে কম কিসের?’ চামারদিঘির আগের স্টেশনে দূরে গাছগুলো ক্রমশ সবুজ রঙ হারাতে শুরু করেছে, লাল হতে শুরু করেছে সূর্যের আলো। আর মাত্র কয়েকটা ক্ষণ তারপরেই বুড়ি নেমে যাবে। আলো থাকতে থাকতে পাশে গিয়ে বসলাম। দামি অ্যানড্রয়েড টা কে রেডি করলাম। বুড়ি কে বললাম ‘মাসি কাঁচটার দিকে তাকাও’, বুড়ি তাকালো, হাসতে বললাম না কারণ দৃশ্যপট টা তাহলে জোলো হয়ে যাবে। স্ক্রিনে আঙুল ছোঁয়াতেই বুড়ি আমার নিজস্বীতে। চামারদিঘি এল। বুড়ি কে নামতে সাহায্য করতে যাব দেখলাম এক জোয়ান মরদ পাঁজাকোলা করে নামিয়ে নিল পরম যত্নে। বুঝলাম ওই আইনাল। দরজাতে দাঁড়িয়ে বুড়ির যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। ট্রেন গড়াচ্ছে আস্তে আস্তে, দেখলাম, সন্ধ্যার আবছা অন্ধকারে আইনাল মিঞার হাতের বেড়ে অতি আদরে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছে একটা সাদা কাপড়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন