এই যে আমি...
‘স্বপ্ন সেটা নয় যেটা মানুষ ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখে, স্বপ্ন সেটাই যেটা পূরণের
প্রত্যাশা মানুষকে ঘুমাতে দেয় না।’— এই সব সেরা সেরা প্রবাদ প্রবচন আমি জীবনের সেরা
সময়ে শিখিনি। পড়েছি, অনেক পরে, বড় হয়ে। জীবনের সেরা সময়, মানে আমার কাছে স্কুলে পড়ার
সময়টায়। তখন আমি স্বপ্ন দেখতাম, বিয়েবাড়িতে ভোজ খাওয়ার। এমনিতে বাড়িতে মাসে এক বার
রসগোল্লা খেতে পেতাম না। বিয়েবাড়িতে গেলে দেদারে খাওয়ার লাইসেন্স। দীর্ঘ কাল রসগোল্লা
না খাওয়ার আক্ষেপ এক দিনে মিটিয়ে নিতাম। এমন করতে গিয়ে যে মাঝে মাঝে দু’চার বার দুর্বিপাক
হয়নি তা নয়। পর দিন পেটখারাপ হয়েছে। তবে বিয়েবাড়িতে যাওয়ার একটাই সমস্যা ছিল। বুবাই’দার
ছোট হওয়া বাটার বুটটা যাও বা ঝেড়েমুছে নিলে চলত, কিন্তু ভাল বলে তুলে রাখা জামাটা
চলত না। কারণ জামায় পাঁচটা বোতামের দু’টো ছিল ভিন্ন রঙের। ওই খুঁত আর সারানোই যায়নি।
আবার পুজোর জামার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয়েছিল। কেনা জামার বোতাম পাড়ার দর্জির কাছে
পাওয়া যেত না। আর সে-ও কম পয়সার খদ্দেরের জন্য কলকাতার বাজার থেকে ওই বোতাম নিয়ে আসার
কোনও গরজ দেখাত না। ও বিশ্বাস করত, অতি সহজ এবং সরল চাহিদা এবং যোগানের নীতিতে। ওর
চোখমুখের অভিব্যক্তি আর তাচ্ছিল্যের ‘না’ আমাকে সেই নীতিই শিখিয়ে দিত প্রতি বার ‘‘ওই
বোতাম পাইনি’’ বলার সময়।
বাবাকে ভাবতাম সুপার হিরো। মানে, সব পারে, সব জানে এমনটাই। বাবা কিছু কিছু জিনিস
জানতও। ভাল ট্র্যানস্লেশন করতে পারত। লেখালিখি করতে পারত। প্রকৃতিকে চিনত। ব্যাঙ্কের
কাজে ভুল করত। বহু বার গ্রাহককে টাকা বেশি দিয়ে ফেলেছিল। দিনের শেষে হিসাব মেলানোর
সময় নিজেকেই সেই ক্ষতি পূরণ করতে হয়েছে। তবে এ সব ছোটখাট ব্যাপার আমি ধর্তব্যের মধ্যেই
আনতাম না। আমার কাছে বাবা ছিল, সুপার হিরো-ই। কিন্তু তাঁকেও এক দিন ভেঙে যেতে দেখলাম।
ব্যাঙ্কের বোর্ড অব ডিরেক্টরর্সের এক জন সদস্য, তিনি আবার এলাকার নেতাও বটে। তাঁর ইচ্ছাপূরণে
মাসের শেষে মিষ্টির দোকানে মোটা টাকার বিল মেটাতে হয়েছে বাবাকে। আমি তখন ক্লাস এইট।
বাড়ি ফিরে মুড়ি আর চা খেতে খেতে বাবা সেই হেরে যাওয়ার কথা স্খলিত গলায় শোনাচ্ছিল
মা-কে। আমাদের বাড়িতে ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি হওয়ার মতো উপায় ছিল না। কারণ জায়গা ছোট।
বারান্দায় বলা গোপনীয় কথা দিব্যি ঘরে পৌঁছে যেত। তখন গরম কাল। আমাদের বাড়িতে তখনও
বিদ্যুৎ সংযোগ আসেনি। হ্যারিকেনের আলোয় আমি সন্ধ্যাবেলার পড়া করছি। ঘরের দরজা খোলা।
বাবার হেরে যাওয়ার কথায় ধাক্কা খেলাম প্রথম বার। তার পর আরও অনেক বার ধাক্কা খেয়েছি।
আবার ঘুরেও দাঁড়িয়েছি। বাবার চরিত্রের সঙ্গে যাদের যাদের মিল খেয়েছে তাদের ছবি তুলে
রেখেছি একটা অ্যালবামে।
পাড়ায় পাড়ায় তখন রবীন্দ্র, নজরুল এবং সুকান্ত সন্ধ্যা হত। এখন ওগুলোকে আমি
‘রসুন সংস্কৃতি’ বলে ঈষৎ নিন্দেমন্দ করতে পারি। কিন্তু তখন আমি আকুল ছিলাম আলোকিত মঞ্চে
ওঠার জন্য। যারা মঞ্চে ওঠে নিজেদের যেমন নাচ, গান, আবৃত্তি ইত্যাদি নানা কাপ্তানি দেখাবে
তারা যে কোথা থেকে কী পদ্ধতিতে জোগাড় হত জানতাম না। সঞ্চালক পাঞ্জাবির পকেট থেকে চোতা
বার করে পড়ে যেত একের পর এক নাম। আবৃত্তিতে... রবীন্দ্র সঙ্গীতে... তাঁকে সঙ্গত করবেন...
ইত্যাদি। তবে একটা জিনিস ভেবে দেখেছিলাম পাড়ার কারা গোপনে গোপনে এ সব সাংস্কৃতিক প্রতিভার
চর্চা গোপনে চালায় তা ধরা পড়ত ওই একটা সময়েই। আমি সেই পদ্ধতিটা জানতে পারিনি বলে ওই
সব অনুষ্ঠানে কোনও সময়েই সময়ে নাম লেখাতে পারিনি কোনও দিন। ‘আমিও একটা কবিতা বলব’ বলে
দিনের দিন একে ওকে ধরতাম। কিন্তু তা কী আর হয়। এক বার সুযোগ এসেছিল ওই করেই। স্টেজে
উঠে দুর্দান্ত শুরু করেও আবার গেলাম কবিতাটা ভুলে। পাশের বাড়ির মেয়েটা প্রাইজ পেল
আবৃত্তিতে। আমি সন্ধ্যা নামার পরেও বাড়িতে ঢুকে ধরা পড়ে গেলাম বাবার কাছে। প্রাইজ
না পাওয়ায় বাপের হাতে বেধড়ক মার খাওয়ার পর থেকেই আমার ‘রসুন' সংস্কৃতিতে ইতি।
বাড়ির পাশেই ছিল রেললাইন। তখন আমাদের পাড়ার কম বয়সি মেয়েদের মাথায় মাঝে মাঝে
কী ঢুকে পড়ত কে জানে! তারা অবশ্য আমাদের মতো বামুনের ঘরের নয়। অন্য পরিবারের। বছরে
তিন-চার বার খবর পেতাম ‘অমুকের মেয়েটা রেলে গলা দিয়েছে’। আমার মনের মধ্যে ছোটবেলায়
ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া লাশ দেখার বাসনা ছিল প্রবল। তাই অমন খবর পেলেই তীব্র আকাঙ্খায়
ছুটে যেতাম রেললাইনের দিকে। ভিড়ের বৃত্তটা ভেঙে ঢুকে পড়তাম কেন্দ্রের কাছাকাছি। দেখতাম,
ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া, ঘিলু বার হয়ে আসা লাশ। কয়েক ঝলক দেখেই বমি পেয়ে যেত। ‘ওয়াক,
ওয়াক’ শুরু করলেই কেউ একটা ওখান থেকে ঠেলে বার করে দিত। সে সিন আর দুপুরে ভাত খেতে
পারতাম না। অবশ্য সেই ভাত জল ঢালা থাকত রাতের জন্য। ভাত তো আর নষ্ট করা যায় না।
স্কুলটা ছিল বেশ কড়া। পড়াশোনার জন্য ছাত্রছাত্রীদের তাতিয়ে দিতেন দিদিমণি
এবং মাস্টারমশাইরা। তবে আমার তাতে জল গরম হত না। কারণ আমার বরাবরই হাফ দামে কেনা সেকেন্ড
হ্যান্ড বইয়ের থেকে পাড়ার লাইব্রেরিতে ফ্রি-তে পাওয়া বইয়ের দিকে নজর ছিল বেশি। ফলে
স্কুলে কপালে দুঃখ ছিল। ক্লাস সেভেনে ওঠার সময়েই লুকিয়ে লুকিয়ে যে ছেলে শরৎ, বঙ্কিম
ছুঁয়ে ফেলেছে তার তো এ সব চাপ থাকবেই। এর ফলটা টের পাওয়া যে কোনও ক্লাসের ফাইনালের
রেজাল্টে। সে দিন বাবার হাতে হাটুরে মার খাওয়াও দস্তুর ছিল। ক্লাস ফাইভ থেকে ক্লাস
টেন পর্যন্ত এই ছ’বছরে মোট ছ’বার ওই ফাইটিং চিত্র ঘটেছে। তবে একাদশ থেকে বাবার মারধর
করা ছেড়ে দিয়েছিল। কারণ আমরা না কি বড় হয়ে যাচ্ছিলাম।
পড়াশোনায় এমন বেওকুফি! প্রায় সকলেই বলত, ‘বামুনের ঘরে গরু’। বাবার মার, প্রতিবেশীর
শেল এ সব থেকে আগলে রাখত মা, বর্মের মতো। নিজের বুকে এ সব আঘাত সহ্য করত। মাকে নিয়েই
এই গোটা গল্পটা লিখে ফেলেও আরও কয়েক লাইন বাকি থেকে যাবে। তার মাঝে বাবাও ঢুকে পড়বে
কয়েক বার, প্রয়োজনের তুলনায় কিছুটা বেশি করেই। কারণ পিতৃতান্ত্রিক সমাজ। বাবাকে বার
বার ঢুকতেই হবে। আমার দিকে তেড়ে যেতে হবে। বার বার আসবে আমার সকল কাজে খুঁত খোঁজা
প্রতিবেশীরাও। তাই বার বার আসতে হবে আমার মাকেও।
এর পর আর একটুই বাকি আছে। আমি তখনও কাজকাম কিছু করি না। বাবা এক দিন বলল,
‘‘শোন তোর বিয়ের ঠিক করে ফেলেছি।’’ আমি তো অবাক! আকাশ থেকে পড়লাম। এ বলে কী! বাবা
বলল, ‘‘আরে বিয়ে তো এখনই হচ্ছে না। সে দেরি আছে। আমার এক কলিগের মেয়ে। তুই একটা সরকারি
চাকরি লাগিয়ে ফেল তো। যা যা এখন থেকে লেগে পড়।’’ আমি দু’চার বছর কমপিটিটিভ পরীক্ষা
দিয়ে সরকারি চাকরির চেষ্টা করলাম। বাড়িতে বন্ধুদের জুটিয়ে গ্রুপ স্টাডি করলাম। নানা
কোচিং সেন্টারের নোট জোগাড় করে পড়াশোনা করলাম। কিন্তু সরকারি চাকরি টাকরি আর পেলাম
না। পরীক্ষা কী দিতাম জানি না। নিশ্চয়ই খারাপ হত। সরকারি চাকরি পাওয়া বেশ কঠিনই।
সব শেষ হয়ে গিয়েছে জেনেও অবশ্য আমি ওই বিয়ের দৃশ্যটা দেখার অভ্যাসটা ছাড়তে পারি
না। একটা মেয়ে শাঁখা-পলা পরা হাতে আমাকে মালা পরিয়ে দিচ্ছে। চারদিকে শোরগোল, ভিড়। আমি
দৃশ্যটার মধ্যে ঢুকে যাই। শীতের রাতে গরম লেপের মতো আঁকড়ে ধরি, চার দিকে ঘন হয়ে আসা
ঠান্ডায় আরও বেশি ওম পাওয়ার চেষ্টায়। আতশকাচের দৃষ্টি ফেলে হাত থেকে মেয়েটার মুখের
দিকে চোখ দু'টো নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। দেখতে চাই কেমন দেখতে তাকে। কিন্তু কিছুতেই
সেটা আর হয়ে ওঠে না। ঘুমটা ভেঙে যায়। রেললাইন থেকে খণ্ডবিখণ্ড দেহ তুলে আমার গাড়িতে
চড়িয়ে মর্গে পৌঁছে দেওয়ার ডাক আসে খুব ভোরে, বাড়তি কর্কশ গলায়।
ছবিঃ অনুষ্টুপ লাই
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন