রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের গল্প : বাঁকুড়ার গ্রাম-চিত্র
'জেলার ধাতটি বড় খেয়ালি ৷ বোশেখ-জ্যৈষ্ঠিতে যত গরম , পৌষ মাঘে তত ঠাণ্ডা ৷ মানুষজনের মনের গড়নও তেমনিই ৷ কখনো উগ্রচণ্ডা মা মনসা , কখন ঠাণ্ডামতি দেবী লক্ষ্মী ৷ তেমাথা বৃদ্ধদের কাছে শোনা এসব বাঁকুড়া জেলার পাথর-কাঁকরের কারণে ৷ তাই হাসি কান্না , শোক আনন্দ , সুখ-দুঃখ সবই খানিক বেহিসেবি ৷ অন্যদিকে ঘর ও পথ , সংসার ও বৈরাগ্য , জীবন ও মৃত্যু কেমন যেন জড়াজড়ি করে থাকে ৷ কে যে কবে ঘর বাঁধে আর কবে ছাড়ে , কে কখন প্রাণ দেয় আর কখন যে কাড়ে তারও হিসেব মেলে না সময়ে সময়ে ৷ '
'গল্পসমগ্র'র ভূমিকায় লিখেছিলেন রামকুমার মুখোপাধ্যায় ৷ লেখকের শৈশব- কৈশোর কেটেছে বাঁকুড়ার গেলিয়া গ্রামে ৷ তিনি অনুভব করেন গ্রামের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায় প্রকৃত ভারতবর্ষকে ৷ গ্রামের মানুষের বিচিত্র জীবন-যাপন , গ্রামীণ অর্থনীতি , রাজনীতি , ধর্ম , লোকাচার , সংস্কৃতি সবকিছু তাঁর চোখে দেখা ৷ তিনি দেখেছেন কিভাবে ক্রমে ক্রমে পাল্টে যাচ্ছে গ্রামজীবনও ৷ এসব তিনি এঁকেছেন তাঁর ছোটোগল্পে ৷ তাঁর অনেক গল্পে ধরা পড়েছে বাঁকুড়ার গ্রামজীবন , গ্রামীণ মানুষের বিচিত্র জীবন- কাহিনি ৷
রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের অনেক ধরনের গল্প লিখেছেন ৷ তবে তাঁর বেশকিছু গল্পে ধরা আছে বাঁকুড়ার গাঁ-ঘরের কথা , রাঢ় বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি ৷ নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি অকপটে বলেন ' আমার বেড়ে ওঠা বাঁকুড়া জেলার একটি গ্রামে , রাঢ় বাংলার সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে ৷ তুষুগান , বাউল , রামায়ণ , কীর্তন এসব নিয়ে আমার শৈশব ও কৈশোরের জগৎ ৷ অষ্টম কিংবা চব্বিশ প্রহরের কীর্তনের ধুলোমাটির যে গ্রাম পরিক্রমা তাতে গোরা হয়ে কতবার নগরভ্রমণ করেছি ৷ কৈশোরের ও পর্বে ষাটের দশকে ভাগচাষী ও কৃষক আন্দোলন দানা বেঁধেছে ৷ ক্ষেতে খামারে সংঘর্ষ , পুলিশের আনাগোনা ৷ গোরার 'নগর ভ্রমণের ' পাশাপাশি প্রায় নিত্যদিনের রাজনৈতিক মিছিল ৷ বৈষ্ণবীয় খোল এবং রাজনৈতিক মাদল দুটোরই গ্রাম পরিক্রমা চলে ৷ বাদ্যযন্ত্রের খোলের টান এবং কৈশোরের কৌতূহলী আবেগ আমাকে আমাকে দু মিছিলে হাঁটিয়েছে ৷' এই হাঁটা তাঁকে চিনতে শিখিয়েছে মানুষ , সমাজ , সংস্কৃতিকে ৷ তাঁর গল্পেও ধরা দিয়েছে এই সব অলিখিত ইতিহাস কথা , গাঁ-ঘরের কথা ৷
রামকুমার মুখোপাধ্যায় বাঁকুড়ার গ্রাম-জীবনকে কেন্দ্র করে যে কটি গল্প লিখেছেন তার মধ্যে অন্যতম 'হাভাতে' ৷ কৈশোরে দেখা গ্রামের পুরোহিত টেলু ঠাকুর এ গল্পে স্মরণীয় চরিত্র হয়ে দেখা দিয়েছে ৷ গল্পে আছে খরা চৈত্রের ভর দুপুরে টেলু ঠাকুরের চতুর্থ সন্তান যখন জন্ম নেয় তখন ঠাকুরমশায় পুজোতে ব্যস্ত ৷ ছেলে পিংলে খবর দেয় তার ভাই ডিংলে হয়েছে ৷ জন্মেই সে খাই খাই করছে ৷ সেই ডিংলে চড়চড় করে শরীরে বাড়ে ৷ উৎপাতও সমাল তালে বাড়ে ৷ আবারও এক পুজোর দিন ছোঁয়াচ লাগে ঠাকুরের ৷ বড় মেয়ের বিয়ে হয় এক বিহারী জামাই দেখে ৷ মেজ মেয়ে দুর্গাপুরের এক ছেলের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে ঘর বাঁধে ৷ আর হাভাতে মুখখিস্তি করা ডিংলেকে নিয়ে টেলুঠাকুর যায় কলকাতায় কাজের খোঁজে ৷ সারা পথ ডিংলে খাই খাই করে এবং কলকাতায় এসে খাই খাই করতে করতে হারিয়ে যায় ৷ 'ডিংলে ততক্ষণে মিশে গেছে হাজার হাভাতের সঙ্গে ৷' ডিংলেকে হারিয়ে টেলু ঠাকুর গ্রামে ফিরে দেখে তার ষষ্ঠবার ছোঁয়াচ লেগেছে ৷ গাঁ ঘরের এই অভাবি গ্রাম্য মানুষদের জীবন যাপন , দুঃখ আনন্দ চমৎকার এঁকেছেন কথাকার ৷ 'হাভাতে'র ডিংলে তাঁর অনন্য সৃষ্টি ৷
'বাঁকুচাঁদের গেরস্থালি' গল্পটিতে বাঁকুড়ার গ্রামজীবন চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে ৷ এই জেলার প্রান্তিক মানুষের কাজ থাকে মাত্র তিনমাস ৷ এই কর্মহীন মানুষগুলো জমির কাজ করতে যায় বর্ধমান , হুগলিতে ৷ চাষবাস ছেড়ে গাড়িতে করে কাঁকর বয় , রাস্তার কাজ করে ৷ এই গল্পের নায়ক বাঁকু ৷ তাঁর জীবিকা বিচিত্র ৷ এক সময় সে তাঁত চালাত , হাঁটে বিক্রি করতো কাপড়-গামছা ৷ মিলের কাপড় বাজারে এলে তাঁত উঠে গেলো ৷ বাঁকুর জীবনে এলো নতুন জীবিকা -'চাল ছাওয়া, পুকুরে জোঁতা রাখা , বিয়ে-পৈতে-শ্রাদ্ধে উনুন করা, লোকের গরু পাল ধরানো৷' তবু অভাব যায় না ৷ চায়ের দোকান চালায় যোগেন ৷ তার বউ কলকাতায় ঝিয়ের কাজ করে ৷ বাঁকুকে যোগেন বলে, তার বউকেও কলকাতায় কাজে পাঠাতে ৷ বাঁকুর বউ যেতে চায় না ৷ শেষমেশ বাঁকু গলায় গামছা দিয়ে আত্মহত্যা করতে গেলে বাঁকুর বউ নোদী পনেরো বছরের মেয়ে নেড়িকে নিয়ে কলকাতার বাস ধরে ৷ আশ্বিন মাস ৷ বাঁকু একা ৷ বসে থাকে রাস্তার ধারে ৷ কুলির কাজ করে ৷ মোট বয় ৷ বিনিময়ে টাকা নেয় ৷ তিনমাস পার হয় ৷ অঘ্রান আসে , বাঁকুর বউ কলকাতা থেকে টাকা পাঠায় না ৷ পৌষে যোগেনের চায়ের দোকানে চুরি হয় ৷ তার বউ যোগেনের জন্য কলকাতায় কাজ দেখে ৷ যোগেনের দোকান ওঠে যায় ৷ বাঁকুর ফাঁকা ফাঁকা লাগে ৷ মনে বাসা বাঁধে বৈরাগ্য ৷ ফাগুন মাসে যোগেনের চিঠি আসে ৷ বাঁকু জানতে পারে , মাস তিনেক আগে তার বউ নোদী বাসে চাপা পড়ে মারা গেছে ৷ মেয়ে বাবুর বাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে পালিয়ে গেছে ৷ গ্রামের মুখুজ্জে বাড়িতে চুরি হলে বাঁকু তাঁদের দোরে পাহাড়ার কাজ পায় ৷ এখানে মুখুজ্জেবাবুদের কাজের মেয়ে রানির সঙ্গে পাকা ব্যবস্থা করে নেয় বাঁকু ৷ ' আষাঢ় মাসের প্রথম দিনে কর্তা-গিন্নি উঠে দেখে বাঁকু নাই, রানি নাই , টিনের থালা দুটো নাই , তারে ঝুলানো কাপড় তিনটে নাই , ডালার চাল পাঁচসের নাই , এমনকি নারকেল কাটার লুতিটি পর্যন্ত নাই ৷ বাঁকু বুঝেসুঝেই নিয়ে গেছে —বউ আনতে কড়ি , ঘর বাঁধতে দড়ি ৷' গল্পকার বাঁকুর মধ্যে দিয়ে গাঁ ঘরের অভাবি মানুষদের একটা পুরো বছরের চিত্রকে আঁকতে চেয়েছেন ৷ এক আষাঢ়ে গল্পের সূচনা ৷ আর এক আষাঢ়ের প্রথম দিনে বাঁকু-রানির নতুন জীবনের খোঁজে অন্তর্ধান হওয়া পর্যন্ত চৌদ্দটি পরিচ্ছেদে গল্পকার দেখিয়েছেন বাঁকুর জীবন , হাহাকার , সুখের সন্ধান ৷ সেইসঙ্গে গ্রামঘরের মানুষদের সারা বছরের যাপনচিত্র ৷
' গোষ্ঠ' গল্পটিতে আছে এক বাগালের জীবন কথা ও আদিমতার ছবি ৷ গ্রামের বাগাল লক্ষণের এক রাতের ছবি গল্পের মূল বিষয় ৷ গরু মোষ ছাগলের পাল থেকে সন্ধে নামার আগে হঠাৎ হারিয়ে যায় এক গর্ভবতী ভেড়া ৷ লক্ষণ ঠাণ্ডা রাতে সারারাত খুঁজে ফিরিয়ে আনে ৷ ভেড়া প্রসব করে দুটো বাচ্চা , একটা মৃত , অন্যটি সুস্থ ৷ আগুন জ্বালিয়ে মা মেয়েকে আরাম দেয় লক্ষণ ৷ আবার নিজেও ভেড়ার স্তনে মুখ লাগিয়ে দুধ খায় ৷ সদ্যোজাতের গায়ের রস মুছিয়ে দেয় নিজের ছেঁড়া জামা দিয়ে ৷ কিন্তু এত করার পরও মালিক-গিন্নির কাছ থেকে লক্ষণ পায় অপবাদ , গালাগালি , খায় মারধর ৷ বাগাল জীবনের নির্মম ছবি ফুটে ওঠে লেখকের কলমে ৷ গ্রাম-জীবনে শ্রমের ধরন , হত দরিদ্র মানুষের জীবন চর্যা , দায়িত্ববোধ সফল ছবি ছবি 'গোষ্ঠ' গল্পটি ৷
রুখাসুখা বাঁকুড়ার গ্রাম-জীবনকে নিয়ে রামকুমার মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম সেরা গল্প 'জৈষ্ঠ ১৩৯০, ঘুঘু কিংবা মানুষ' গল্পটি ৷ পেটে ভাত থাকলে মুখে হাসি থাকে ৷ দাম্পত্যে সুখ থাকে ৷ সুচাঁদের তা নেই ৷ তাই সে মরতে যায় ৷ সুচাঁদ বাড়ি ফেরে না ৷ সুচাঁদের বউএর উৎকণ্ঠা বাড়ে ৷ কিন্তু রাতে ফিরে আসে সুচাঁদ ৷ বউকে বলে ' মরতুম বটে ! সাঁওতালডির পোস্টটা ধরে তরতর করে উঠছি ৷ আর একটু হলেই হাত পাব ৷ তা তারের ওপর একটা ঠ্যাঙা ছিল ৷ একজোড়া ঘুঘু পিরিত করতে করতে বসল গিয়ে ঠ্যাঙাতে ৷ ঠিকা গেল তারে তারে ৷ শালা খাইচে শক—চিৎপটাং ৷ বলি খিদার জিনিস ভগবান দিছেন , মরতে যাব কোন দুঃখে ? তার উপর তুই উপোস করে আছিস বটে ৷' পিরিতি করতে গিয়ে মরে ঘুঘু , আর ঘুঘুর মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে সুচাঁদ আর বউ যায় কেতন-কিয়ারির মেলায় ৷ পথে চেয়ে চিন্তে খেয়ে নেয় সস্তার মদ ৷ অভাব , ক্ষুধা , কলহ ভুলে মুহূর্তে বাঁচে এরা ৷ ক্ষুধার পেট আর ভরা পেটের আনন্দ উপলব্ধ হয় ৷ গল্পে ফুটে ওঠে রুক্ষ বাঁকুড়ার জীবিকাহীন মানুষের সংগ্রাম , প্রেম , প্রেমহীনতা ও বেঁচে থাকার কাহিনি ৷
গ্রামজীবনের প্রেমের গল্প 'সম্পর্ক' ৷ গল্পের নায়ক কেষ্ট বাগদি ঘুঘু ধরতে গিয়ে গদাধর গায়ের বিচ কুমড়ো চুরি করে ৷ বিচারে জরিমানা হয় এগারো টাকা ৷ কেষ্টর বউ বাঁকুড়ায় পিচ ঢালার কাজ করতে গিয়ে জেতেনের সঙ্গে জোড় বেঁধে চলে গেছে ৷ কেষ্ট ফিরিয়ে আনতে যায়নি ৷ গ্রাম পঞ্চায়েতের বিচারে একান্ন টাকা জরিমানা হয় কেষ্টর ৷ কিন্তু কেষ্ট এত টাকা দিতে পারবে না ৷ ঠিক হয় কুন্ডুর টাকাটা আপাতত দেবে ৷ আর কুন্ডুর ঘরে মুনিষ খেটে সুদ সমেত শোধ করবে কেষ্ট ৷ কুন্ডুর ঘরে মুনিষ খাটতে খাটতে কুন্ডুর মেয়ে মালীর সঙ্গে ভাব হয় কেষ্টর ৷ একদিন দুজনে উধাও হয়ে যায় ৷ গ্রামঘরে রসালো আলোচনা চলে ৷ কুন্ডু জানতে পারে বোজোশোলে দুজনে ঘর বেঁধেছে ৷ একদিন কেষ্ট-মালী বৈষ্ণব হয়ে গ্রামে ফেরে ৷ ঠাঁই হয় কুন্ডুর ঠাকুরস্থানে৷ মেয়েকে কাছে রাখতে চায় কুন্ডু ৷ কিন্তু গর্ভবতী মালী ৷ শহরে গিয়ে কুন্ডু বংশধরের শিকড়টা উপড়ে নিয়ে আসে ৷ জাতপাতের বিভেদ গল্পে প্রকট হয়ে ওঠে ৷ সেই সঙ্গে অর্থ-প্রতিপত্তি যে প্রেম-সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তার ছবিও ফুটে ওঠে গল্পটিতে ৷ কিন্তু শেষমেশ প্রেমকেই জিতিয়ে দিয়েছেন গল্পকার ৷ কারণ গল্পের শেষে কেষ্ট-মালী গেরুয়া ত্যাগ করে ঘরবাঁধার টানে আবার নিরুদ্দেশ হয়৷
এছাড়া 'দায়বন্ধ' 'সুখ' 'জ্যোতিষী' 'উপকথা' 'বনমালীর পৃথিবীতে ফেরা' 'আকর্ষণ-বিকর্ষণ' 'চরৈবেতি 'লাঙ্গলী' 'সখিনা' 'হাউসে' 'রঙ' এরকম বহু গল্পে রামকুমার মুখোপাধ্যায় গাঁ ঘরের কথা , গ্রাম-চিত্রকে চমৎকারভাবে গল্পে তুলে এনেছেন ৷ আর যখন তা সত্তর-আশির দশকের বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রাম গল্পের পট হয় তখন তা অন্যমাত্রা পায় ৷ শৈশব আর কৈশোরের স্মৃতি তাঁর গল্পে বারে বারে ফিরে আসে ৷ বাঁকুড়ার লোকসংস্কৃতির নানা অনুসঙ্গ, গ্রামীণ মেলা, পরব, লোকছড়া , লোকগান, লোকদেবতারা গল্পে ঠাঁই পায় ৷ আবার পোষাক-পরিচ্ছদের রকম ফের , বৃত্তি , পেশা , নেশা , খাবার যেমন তাঁর গল্পে আছে, তেমনি বাঁকুড়ার গ্রামীণ ভাষা , প্রবাদ-প্রবচনও কম নেই ৷ সব মিলে বাঁকুড়ার প্রকৃতি , মানুষ , গ্রাম- সমাজ তাঁর গল্পে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে ৷ গল্পকার লালমাটির দেশের মধ্যে খুঁজে পেতে চেয়েছেন জীবনের প্রকৃত সত্যকে ৷
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন