পাঠ প্রতিক্রিয়াঃ বিশ্বজিৎ লায়েক

 



লাফ মেরেছি জলে…

বিশ্বজিৎ লায়েক

 

একটি বই পড়ার পর অনুভব কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।হয় মন ভারাক্রান্ত হয় অথবা ফুরফুরে।কিন্তু অলিন্দ ও নিলয়ে রক্তচাপ বাড়ে।বাড়তেই থাকে। ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে ভাবতে থাকি আলো ক্রমশ ফুটে উঠছে পাতায় পাতায়। কিম্বা মনের ভার আরো একটু দীর্ঘ হল…

তারপর কী হয়!

অনুভব ভেঙে ভেঙে গোধুলির কালখণ্ডে সমগ্র চৈতন্য অনু-পরমানু।হ্যাঁ, অনুভব ভাষা পেতে চায়।অক্ষর পেতে চায়।

আলো পেতে চায়।

 

ধানের গন্ধ এক রকম। নিম পাতার গন্ধ আরেক রকম। লেবু পাতার গন্ধ আরো অন্য রকম। বই এর গন্ধও আমি টের পাই। আমি কেন অনেকেই টের পান। একেকটা বইএর গন্ধ একেক রকম। মলাটের গন্ধ কলাপাতার মতো হলে ১০ এর পাতায় গিয়ে দেখি গন্ধ বদলে গেছে। এখানে পাতায় পাতায় এখন সজনে ফুলের গন্ধ। কিছু দূর গিয়ে আরো দেখিমনে হয় যেন পদ্মবনে এসেছি।

 

বই এর পরিবর্তে যখন পিডিএফ হাতে আসে! তখন কি ইচ্ছে করে না একটু পড়ে দেখি।

নিশ্চয় করে।

আলবৎ করে।

পড়িও।

মন দিয়েই পড়ি কিন্তু সেই গন্ধটা টের পাই না। মনে হয় যেন জিকে পড়ছি। মনে হয় যেন পাতার পর পাতা অফিসিয়াল অর্ডা্র কপি পড়ছি।

আজ সন্ধ্যায় পড়ছিলাম অরুণ মিত্র। অনুবাদের সমস্যা নিয়ে তিনি লিখছেন- ‘অনুবাদ অর্থাৎ এক ভাষাকে আর এক ভাষায় রূপান্তরিত কার এমন কাজ যার প্রতি পদেই সমস্যা। একদিকে যেমন যান্ত্রিক হবার তাগিদ, অন্যদিকে তেমনি মৌলিক হবার আহ্বান, এই দুই পরস্পর-বিরোধিতার মাঝখানে তার পথ চলতে হয়। এ কাজের প্রকৃতি প্রথম থেকেই দ্বৈত। নিজের ভাষায় মগ্ন হয়ে নিজের খুশিতে লিখে যাওয়া নয়, একই সঙ্গে দুই ভাষার স্তরে মনকে নিযুক্ত রাখা, দুই ভাষা নিয়ে মাথা ঘামানো এবং দুই ভাষার চালচলন পদ্ধতিপ্রকরণের উপর প্রতিমুহূর্ত নজর রাখা। সুতরাং অনুবাদকর্মেও প্রথম শর্তই হল দুটি ভাষা সম্বন্ধে পর্যাপ্ত জ্ঞান। সমান জ্ঞান বলব না। কারণ এ কাজের একদিকে পাল্লা ভারী হবেই, যে-দিকটায় জ্ঞানের সঙ্গে অনুভবও যুক্ত হয়। যে ভাষা থেকে অনুবাদ করা হয় সেই ভাষা প’ড়ে তার সঠিক অর্থ বোঝাই আসল, যেহেতু সেই ভাষায় অনুবাদক লিখছেন না, তিনি পড়ছেন।”

 

এখন প্রশ্ন হল আমার দু-দিকের পাল্লাই ভাঙা।সামান্য ভাঙা হলেও কাজ চলে যেত কিন্তু একে পাল্লা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে তৈরি তার উপর নড়বড়ে দড়ি দিয়ে বাঁধা। আমি বুঝব কেমন করে কার জলে ভাল ডাল সেদ্ধ হয়- কাঁসাই না দামোদর! কুমারী নাকি দ্বারকেশ্বর!

 

এটাও ঠিক আমার মত পাঠক অত বোঝাবুঝির মধ্যে যাবই বা কেন।দিব্যি পড়ব। হাত-পা খুলে নাচব। আরো কয়েক জনকে বলব- পড়ুন।কিন্তু তিনি পড়বেন কি পড়বেন না সেটার উপর আমার হাত আগেও ছিল না এখনও নেই। ভবিষ্যতে থাকবে সে গ্যারান্টিও দিতে পারব না।

অবশ্য যে সব পাঠক ভাল রকম বোঝাবুঝির মধ্যে আছেন তাঁদের নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। মানে না বলাই শ্রেয়।

 

যাহ!

সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে ত।

গুলিয়ে যাবার আগে একটা লেখা পড়ি আসুন-কৌশিক ভট্টাচার্যের ‘BOOKভরা ননসেন্স’ থেকে

 

টেবিল  আর চেয়ারের গপ্প

 

“টেবিল বলে, “চেয়ার ভায়া,

চল না আসি ঘুরে!

আর পারি না, গরম কি এ!

গা উঠেছে চিড়বিড়িয়ে

থাকবো ভুলে, আড্ডা দিয়ে,

একটু গেলে দূরে!”

 

চেয়ার বলে, “টেবিল দাদা,

তাও কি বল হয়?

বোকার মত বলছ যা তা

নেই কোন-ই মুন্ডু-মাথা

দেখছো না এ’ পায়ের পাতা

হাঁটার জন্য নয়!”

 

টেবিল বলে শ্বাসটি ফেলে,

“একটু তো আন জোশ!

দুজন মিলে কোথাও যাওয়া

লাগবে গায়ে নতুন হাওয়া

তাই তো এত ঘুরতে চাওয়া

চেষ্টাতে কি দোষ!”

 

মনের সুখে হাঁটল ওরা

চলল হাওয়া খেতে।

দুলকি চালে, রাস্তা ধরে

ঠকঠকাঠক আওয়াজ করে

দেখল কত দু চোখ ভরে

মজায় যেতে যেতে।

 

টেবিল হাঁটে, চেয়ার হাঁটে

অবাক যত লোকে

সবাই বলে রাস্তা ছেড়ে,

“কামড়াবে কি? আ…

পথ হারিয়ে যখন ওরা

বেদম ভ্যাবাচ্যাকা,

কোথার থেকে রাস্তা জানা

গুবরে পোকা, ইঁদুরছানা

প্যাঁকপ্যাঁকে হাঁস বাগিয়ে ডানা

ওদের দিল দেখা।

ফিরলো বাড়ি দুজন ওরা

আর এলো তিনমূর্তি।

মনের মত বন্ধু পেয়ে

নাচলো সবাই, উঠলো গেয়ে,

পোলাও, কাবাব, মাংস খেয়ে

জোর চালালো ফুর্তি!      

 

চেয়ার নিয়ে, টেবিল  নিয়ে,

শেষ কথাটা এই

খাবার খেল কেমনি তারা

কোথাও কোনো মুন্ডু ছাড়া

বুঝিয়ে দেবে তোমায় কারা

আমার জানা নেই।“

 

পাশাপাশি মূল লেখাটাও পড়ে দেখুন…

 

The Table and the Chair

 

I

“Said the Table to the Chair,

'You can hardly be aware,

'How I suffer from the heat,

'And from chilblains on my feet!

'If we took a little walk,

'We might have a little talk!

'Pray let us take the air!'

Said the Table to the Chair.

 

 

II

Said the Chair unto the Table,

'Now you know we are not able!

'How foolishly you talk,

'When you know we cannot walk!'

Said the Table, with a sigh,

'It can do no harm to try,

'I've as many legs as you,

'Why can't we walk on two?'

 

 

III

So they both went slowly down,

And walked about the town

With a cheerful bumpy sound,

As they toddled round and round.

And everybody cried,

As they hastened to their side,

'See! the Table and the Chair

'Have come out to take the air!'

 

 

IV

But in going down an alley,

To a castle in a valley,

They completely lost their way,

And wandered all the day,

Till, to see them safely back,

They paid a Ducky-quack,

And a Beetle, and a Mouse,

Who took them to their house.

 

 

V

Then they whispered to each other,

'O delightful little brother!

'What a lovely walk we've taken!

'Let us dine on Beans and Bacon!'

So the Ducky, and the leetle

Browny-Mousy and the Beetle

Dined, and danced upon their heads

Till they toddled to their beds.”

 

এই ননসেন্স প্রচেষ্ঠার ভিতর যেমন এডওয়ার্ড লিয়ার আছেন; আছেন রোয়াল্ড ডাল, স্পাইক মিলিগান। সবলেখা ধরে ধরে উল্লেখ করার তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না।পাঠক পড়বেন এটা আমি দ্বিধাহীনভাবে বলতে পারি।কারণ আমরা বাঙালিরা বহু আগে থেকেই এইসব পড়ছি।হ্যাঁ, সুকুমার রায়ের কথা বলছি।আবোল তাবোল, হ য ব র ল পড়েননি এমন বাঙালির শৈশব শুধু যন্ত্রণার নয় অসহ ভারে পীড়নও বটে।

যেমন পীড়ন ও বলের অসাম্যে দাঁড়িয়ে থাকে পিডিএফ যন্ত্রণা। ঘাড়ে ব্যথা হয় না বটে চোখে ব্যথা লাগে , খানিক মনেও।

আর মন ও চোখের আরামের জন্যই একটা শেষ কথা বলি- কৌশিক বাবুর এই বইটি আগামী বইমেলাতে আমি ও আপনি দুজনেই কিনব। বই এর পাতাভরা গন্ধ শুঁকে নেওয়ার জন্য আর কয়েকটা দিনের অপেক্ষা আমরা করতেই পারি। কি বলেন অভিজিৎ বাবু!



Bookভরা ননসেন্স: বেগুনি রঙের গোরু । কৌশিক ভট্টাচার্য। জয়ঢাক প্রকাশনা। ২৮০ টাকা

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

যোগাযোগ ও লেখা পাঠানোর ঠিকানাঃ spartakasmagazine@gmail.com

  একটি লড়াকু পত্রিকা সম্পাদকমণ্ডলীঃ   অভিজিৎ   ঘোষ ,  অনির্বাণ সরকার ,  এয়োনিয়ান   অনির্বাণ ,  সুমিত পতি ,  মনোহর   হোসেন   মণ্ডল, চিরঞ্জিত ...